চরা নদী খননের নামে তুঘলকি কারবার চলছে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জে। খাল বাঁচানোর নামে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক গাছ কেটে সাবাড় করেছে ঠিকাদার। এ ছাড়া খালের এক পাড়ের পাকা রাস্তার অর্ধেক, অপর পাড়ের ইট সোলিং রাস্তার পুরোটাই বন্ধ করে ফেলেছে মাটি তুলে। টেন্ডারে কী আছে, আর কাজ হবে কোন পন্থায়-সেসব বিষয়ে জানেন না স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধি। তাড়াহুড়ো করে কাজ শুরু করতে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে খালটি। এতে সেচ সংকটে পড়েছেন আশপাশের বহু কৃষক।
সরেজমিনে চরা নদী খনন নিয়ে ঠিকাদারের নয়-ছয়ের নানা চিত্র দেখা যায়। এলাকাবাসী জানায়, একসময় প্রমত্তা নদী ছিল চরা। সুন্দরবন থেকে শুরু হয়ে ১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাজুয়ায় গিয়ে মিলেছিল এই প্রবাহ। পরে বাঁধ হওয়ায় তা মরে খালে পরিণত হয়। আর এখন ঠিকাদার ও এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার মিলে খননের নামে একে ড্রেন বানানোর ষড়যন্ত্র করছে।
জানা গেছে, ইউনিয়নের ৫ ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সরাসরি এই খালের পানি ব্যবহার করেন। খাল সংলগ্ন ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ফয়সাল আলম, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অমিত মণ্ডল, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রবীর মণ্ডল, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তপন সরকার, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুখেন্দু রপ্তান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার স্বপন মণ্ডল অভিযোগ করেন, ঈদের আগে হঠাৎ একদিন ভেকু মেশিন এনে কাজ শুরু করেন ঠিকাদার। হরিণটানা ঘোলের খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড কাজটি পেলেও কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় উপজেলা প্রকৌশলী তাদের কাজ দিলেন, কত টাকার কাজ, কত দিনে সম্পন্ন হবে, কীভাবে কাজ হবে- সে সম্পর্কে আমরা কেউই অবগত নই।
তারা আরো বলেন, ভেকু মেশিনে খালের মাটি কেটে কোথাও পাড়ে, আবার কোথাও খালের ভেতরেই ফেলে রাখা হয়েছে। পাহাড় সমান মাটির স্তূপের নিচে ঢাকা পড়েছে কৈলাশগঞ্জ পশ্চিমপাড়া পিচের রাস্তার প্রায় অর্ধেক, আর ১ নম্বর ওয়ার্ড দশঘরের ইট সোলিং রাস্তা পুরোটাই। খালের তলদেশ চার ফুট করে খনন করার কথা থাকলেও এক থেকে দেড় ফুটের বেশি খোঁড়া হচ্ছে না কোথাও। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, খালের পাড়ের অন্তত তিন শতাধিক নানা প্রজাতির গাছ ইতোমধ্যে কেটে বা ভেকু মেশিন দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কিছু গাছ মাটিচাপা পড়ে মৃতপ্রায়।
বাজুয়া এসএন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক প্রলয় মজুমদার অভিযোগ করেন, আগে খালের দুই পাড় সবুজ ছিল। এখন মরুভূমি হয়ে গেছে। তিন শতাধিক গাছ মরে গেছে। এর মধ্যে গেওয়া, শিরিস, বাবলা, সজনে, নিম, বড়ই, কলা, পেঁপে গাছও আছে।
রামনগর গ্রামের কৃষক রামমোহন মণ্ডল অভিযোগ করেন, তরমুজের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলের সব কৃষক চাষের জন্য খালের পানি ব্যবহার করতাম। হঠাৎ একদিন আমাদের বলা হলো যার যার পানি লাগবে নিয়ে নাও। আমরা খাল শুকিয়ে মাটি কাটব। এরপর ডিপের পানি কিনে চাষ করতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেল।
হরিণটানা ঘোলের খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শংকর পাইক দাবি করেন, চাষিদের স্বার্থে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খাল খনন প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি। এর আগে আরো তিনটি খাল খননের অভিজ্ঞতা থাকায় আমরা কাজ পেয়েছি। ৮২ লাখ টাকা বাজেটের এই কাজের মেয়াদ তিন মাস। আমাদের হাতে এখনো ২৬ দিন সময় আছে। খালের ৫ কিলোমিটার অংশ খনন করতে হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারব। ভেকু মেশিনে ৭০ ভাগ কাজ হবে, ৩০ ভাগ কাজ হবে সমিতির সদস্যদের মাধ্যমে। কাজ করতে গিয়ে কিছু গাছ কাটা পড়েছে। আর খালের মাটি ফেলার কারণে পিচের রাস্তা ও ইট সোলিং রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলেও সেটা পরিষ্কার করা হবে।
অভিযোগ আছে, সমিতির সভাপতি তপন মণ্ডল কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। আর সাধারণ সম্পাদক শংকর পাইক ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শংকর বলেন, এক সময় সবাই আওয়ামী লীগে ছিলাম। কিন্তু এখন তো দেশেই আওয়ামী লীগ নেই।
কথা বলার জন্য দাকোপ উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সরদার বলেন, চরা নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে। কাজ শেষ হলে আমরা দেখব নকশার সঙ্গে ঠিক আছে কি-না।