ফ্যাসিবাদ সরকারের পতনের পর থেকে যশোর জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের আড়াই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থান থেকে এখনো বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অপকর্মের অভিযোগ আসছে। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, যত প্রভাবশালী হোক না কেন, অন্যায়-অপকর্ম প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে ঘটনার উল্টো পিঠও রয়েছে। দলের তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর দাবি, ফ্যাসিস্ট রেজিমে তাদের সম্পত্তিও দখল করে নেয় ‘আওয়ামী লীগের চিহ্নিত গুন্ডারা’। এখন তারা যদি সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হন, তাহলে তা অন্যায়। এ ক্ষেত্রে নেতাদের বক্তব্য, ক্ষতিগ্রস্ত এমন হাজার হাজার নেতাকর্মী রয়েছেন- এ কথা সত্য। তবে তাদের দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি অবশ্যই আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে হতে হবে। কোনোমতেই বলপ্রয়োগ করা যাবে না।
যশোর জেলা বিএনপি সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট হাসিনা রেজিম পতনের পরপরই জেলার নানা প্রান্ত থেকে দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে থাকে। জেলা বিএনপি ওই দিনই নেতাকর্মীদের সংযত হতে সতর্কবার্তা দেয়। তা সত্ত্বেও বহু নেতাকর্মীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। কারো কারো বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পলাতক সন্ত্রাসী বা কথিত জনপ্রতিনিধিদের পুনর্বাসনচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। আবার আওয়ামী নেতাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি দেখেশুনে রাখার অভিযোগও রয়েছে বিএনপির কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে। ঘাট, জলাশয়, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগেরও অন্ত নেই। এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার লেনদেন অথবা পেশিশক্তির প্রয়োগ। এর ফল হিসেবে একের পর এক সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে থাকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে।
বিএনপির যশোর জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু আমার দেশকে জানান, এখন পর্যন্ত দলটির দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে প্রতিদিনই অভিযোগ আসছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জানান, সাংগঠনিক ব্যবস্থার মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার, কারণ দর্শানোর নোটিস জারি এবং সতর্ক করে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে গঠনতন্ত্রে। যশোরে এর সবগুলোই প্রয়োগ করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, মণিরামপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য, উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান নিস্তার ফারুককে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে দলের জেলা কমিটির সদস্য এ কে শরফুদ্দৌলা ছোটলু, সদরের কাশিমপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আইয়ুব হোসেনসহ বেশ কিছু ইউনিয়নের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধেও।
এ ছাড়া অভয়নগরের নওয়াপাড়া পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান জনির পদ স্থগিত করা হয়। শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহিরকে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করা হয়েছে। অভয়নগর উপজেলা কমিটির সভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান, বাঘারপাড়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান, সাবেক মেয়র আব্দুল হাই মনাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় সতর্ক করে শেষবারের মতো রেহাই দেওয়া হয়েছে। জেলার নানা প্রান্তের অন্তত ৫০ নেতাকর্মীকে একইভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদ্যবিদায়ী সভাপতি রাজিদুর রহমান সাগর এখন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার সংগঠনের জেলা কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম হায়দার সনিকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্রদলের অন্তত ১০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংগঠন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে সরকারি সিটি কলেজ শাখার সদস্য সচিব শাওন ইসলাম সবুজ, মণিরামপুর উপজেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন, সদর উপজেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন, ঝিকরগাছা পৌর শাখার আহ্বায়ক শামিম রেজাকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় বহিষ্কার করা হয় দুই কর্মীকে। যদিও সেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন আছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, দলের কারো বিরুদ্ধে হত্যা বা এমন গুরুতর ঘটনার মামলা হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে সাসপেন্ড করা। যতদিন পর্যন্ত তিনি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত না হচ্ছেন, ততদিন এই সাজা বহাল থাকবে।’
যশোরে ৫ আগস্টের পর নেতাকর্মীদের বাগে আনতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এই তরুণ নেতা আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু বিএনপিও যদি একই পথে হাঁটে তাহলে তো আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো পার্থক্য থাকে না। সেই কারণে উচ্ছৃঙ্খলতা রোধে দল প্রথম থেকেই কঠোর।
এদিকে, ফ্যাসিস্ট জামানায় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মী নানাভাবে জুলুম-নির্যাতন এমনকি গুম-খুনের শিকার হয়েছেন শাসক দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কেউ কেউ পাল্টা অ্যাকশন নিতে গিয়ে দলীয় শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। আবার আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বেদখল হওয়া সম্পত্তি নিজের আয়ত্তে নিতে গিয়েও কেউ কেউ একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি শার্শা ও চৌগাছা অঞ্চলের তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে তাদের কেউ গণমাধ্যমে নিজ পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। সম্প্রতি বহিষ্কার হওয়া সদর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন আওয়ামী লীগ আমলে র্যাবের হাতে ছয় দিন গুম ছিলেন বলে তার সংগঠনই স্বীকার করে।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী জমানায় যারা নিপীড়নের শিকার, তাদের বিরুদ্ধে এখন অনুকূল সময়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বুক ভেঙে যায়। কিন্তু ব্যক্তির ওপরে দল। যেকোনো মূল্যে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।’