হোম > সারা দেশ

বাস্তবায়নের পথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা

স্বপ্ন বুনছে উত্তরের মানুষ

হাসান উল আজিজ, লালমনিরহাট

উত্তরাঞ্চলের দুঃখ বলে পরিচিত প্রমত্তা তিস্তাকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন বুনছে নদীপাড়ের মানুষ। বহু প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’বাস্তবায়নের উদ্যোগে আশার আলো দেখছে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার কোটি মানুষ। প্রকল্পটি নিয়ে ভারত এতোদিন বাংলাদেশকে চাপে রেখেছিল।

কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মোড় ঘুরেছে। এমন প্রেক্ষাপটে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতকে উপেক্ষা করে চীনের সাহায্য নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এটি বাস্তবায়ন হলে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের অবসান হবে। এ ছাড়া তিস্তা ফিরে পাবে তার পুরোনো চিরচেনা খরস্রোতা রূপ। যা ওই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রতি তিস্তা পরিদর্শনে এসে চায়না পাওয়ার কোম্পানির কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ সময় তারা নদীভাঙন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে উত্তরবঙ্গে সফরে গিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছিলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার নকশা আগামী অক্টোবরের মধ্যেই চূড়ান্ত হবে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের সংকট নিরসনের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

জানা গেছে, ২০১১ সালে তিস্তা পানিচুক্তি বাস্তবায়ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে বাধাগ্রস্ত হয়। তখন থেকে বাংলাদেশ সরকার এ পানিচুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি তিস্তা নিয়ে বিকল্প চিন্তা শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ।

পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। একই বছর মার্চে বাংলাদেশকে চীনের চায়না পাওয়ার কোম্পানি প্রতিবেদন জমা দেয় এবং প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়।

তবে ভূরাজনৈতিক কারণে ভারত তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণকে নিরাপত্তা হুমকি মনে করে শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে। চীনের অংশগ্রহণে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে বহুমুখী ব্যারাজ নির্মার্ণের যে তৎপরতা, ‍সেটি এতদিন আটকে ছিল ভারতের আপত্তির কারণে। বিশেষ করে, ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’-এর পাশ দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হওয়ায় এ অঞ্চল কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। যেখানে চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য অস্বস্তীকর।

১৯৭৫ সালে জলপাইগুড়ির গজলডোবার বাঁধ নির্মাণ করে ভারত তিস্তার উজান থেকে পানি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে ভুগতে হয় তিস্তার দুই তীরের মানুষকে। ফলে ধীরে ধীরে এই অঞ্চল রুপান্তরিত হচ্ছে মরূভূমিতে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় করে পাওয়ার চায়না কোম্পানি ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। সে সময় পাওয়ার চায়নার কোম্পানি জানায়, এ প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরের পাঁচ জেলায় ১১০ কিলোমিটার নদীপথে এক হাজার ৩৩০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং, ৬৭টি গ্রোয়েন-স্পার নির্মাণ ও মেরামত, নদীতীর সুরক্ষা ও বাঁধ নির্মাণ, নদীর দুপাড়ে রাস্তা ও সেচ অবকাঠামো নির্মাণ এবং ১৭০ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটা ভূমি পুনরুদ্ধার করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে।

প্রকল্প ঘিরে স্বপ্ন বুনছে তিস্তাপাড়ের মানুষ। কৃষক রাজু মিয়া, মকবুল হোসেন, তসর উদ্দিন বলেন, শুকনো মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার থাকে, তখন ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে কোনো চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। যতটুকু চাষাবাদ করা হয়, ‍সেটি করা হয় শ্যালো মেশিনের পানি দিয়ে । অন্যদিকে বর্ষায় ভারত পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের ভাসিয়ে দেয়।

নৌকার মাঝি বাহার মিয়া ও কুদ্দুস আলী জানান, তিস্তার যৌবন কেবল বর্ষায় ফিরে আসে, বাকি সময় শুধু বালুচর। বছরের অন্য সময় পানি না থাকায় মানুষ হেটে তিস্তা পার হতে পারে। ফলে জীবন চালানোর জন্য তাদের পেশা বদলাতে হচ্ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ পেশা ধরে রাখবেন বলে জানান তারা।

রাজপুরের মোবারক হোসেন বলেন, চরের জমিতে আমরা কষ্ট করে চাষ করি। যদি সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাহলে ঢাকাবাসীর চেয়েও আমরা বেশি লাভবান হব।

তিস্তা নিয়ে আন্দোলন‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’-এর প্রধান সমন্বয়ক বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা এখন জাতীয় দাবি। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এটি বাস্তবায়ন হলে নদীপাড়ের দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ হুমকি থেকে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া আর দিল্লির তাঁবেদারি চলবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এসএ হামিদ বাবু বলেন, এটি বাস্তবায়ন হলে দুই তীরের হাজার হাজার একর আবাদি জমি বাঁচবে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীশাসন, আধুনিক সেচ, মাছ চাষ, পর্যটনকেন্দ্রসহ প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’স্লোগানে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে ১১৫ কিলোমিটার তিস্তা তীরে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেন। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া কর্মসূচির শেষদিন ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছেÑএমনটাই আশা করছে তিস্তাপাড়ের মানুষ। তারা বলছে, এবার হয়তো প্রমত্তা তিস্তা ফিরে পাবে তার চিরচেনা রূপ।

লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ছয় পদে বিএনপির জয়

দর্শনায় হাতপায়ে শিকল বাঁধা অপহৃত ব্যক্তি উদ্ধার

ঝিনাইদহে খাজনার নামে চাঁদাবাজি, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

কুসিক প্রশাসক পদে আলোচনায় টিপু ও আবু

সহকারী শিক্ষিকাকে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন

আমার দেশে সংবাদ প্রকাশের পর মানববন্ধনের ডাক

ঈদে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু ৩ মার্চ

ব্যবসায়ীদের মার্জিমাফিক চলছে রংপুরে নিত্যপণ্যের বাজার

লক্ষ্মীপুরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১০ দোকান পুড়ে ছাই

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন এমডি হলেন ভারতীয় প্রকৌশলী রমানাথ