বৈশ্বিক সংকটে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ের পর থেকেই কমতে শুরু করে তৈরি পোশাক রপ্তানি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এই শিল্পে। ক্রেতাদের কাছ থেকে ফরমায়েশ কমার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া বেড়ে গেছে। তার ওপর দেশে বেড়েছে পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুতের লোডশেডিং। সবমিলিয়ে চতুর্মুখী সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। এই অবস্থা চলতে থাকলে অধিকাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিজিএমইএ।
বিজিএমইএর পরিসংখ্যান বলছে, গত মার্চ মাসে দুই দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চে রপ্তানি হয়েছিল তিন দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক। সে হিসাবে এই সময়ে রপ্তানি কমেছে ১৯ শতাংশের বেশি। এর আগের মাস অর্থাৎ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে দুই দশমিক ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের।
গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল তিন দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, প্রবৃদ্ধির হিসেবে যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কম। এভাবে চলতি অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই মাস ছাড়া প্রতি মাসেই নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি রয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মোট তিন দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল; যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু এর পরে প্রতি মাসে রপ্তানি কমেছে ধারাবাহিকভাবে। আগস্ট মাসে কমেছে চার দশমিক ৭৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে পাঁচ দশমিক ৬৬ শতাংশ, অক্টোবরে আট দশমিক ৩৯ শতাংশ, নভেম্বরে পাঁচ শতাংশ, ডিসেম্বরে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে এক দশমিক ৩৫ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে তা কমে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। ৯ মাসে পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে বিশ্ব আরো দুটি যুদ্ধ ফেস করেছে। জ্বালানির কারণে এই যুদ্ধ আমাদের দেশকে বেশি প্রভাবিত করেছে। কিন্তু রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এক বছর ধরেই টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। এই বাস্তবতায় ক্রেতারা অনেক হিসাব-নিকাশ করেই অর্ডার দিচ্ছে। সেখানে চীন আর ভিয়েতনামের কাছে আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত করতে অন্তত ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমাদের আমদানি করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পায়। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন আর ভিয়েতনামে এই প্রতিবন্ধকতা নেই। আর এই কারণে ক্রেতাদের প্রথম দুটি পছন্দের তালিকায় এখন চীন আর ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান তিন নম্বরে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্রুত সময়ের মধ্যে থেমে যায় তাহলেই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, নাহলে স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
শিপিং লাইন সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বেস পোর্টে একটি ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ছিল এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ ডলার। বর্তমানে কোম্পানি ভেদে একটি ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া পড়ছে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত। যুদ্ধের আগে আমেরিকাগামী কনটেইনারের ভাড়া ছিল দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ডলারের মধ্যে। যুদ্ধের কৌশলগত কারণে এই রুটে ভাড়া তুলনামূলক কম বেড়েছে। তারপরও প্রতি কনটেইনারে ৬০০ ডলারের কাছাকাছি বিভিন্ন নামে মাশুল বাড়ানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এক কনটেইনার রপ্তানি পণ্য পাঠাতে জাহাজ ভাড়া ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যগামী জাহাজের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। যে দুয়েকটি চলছে সেখানে প্রতি কনটেইনার এক হাজার ২০০ ডলারের ভাড়া গুনতে হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, হরমুজ প্রণালির সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য চলাচলের খুব বেশি সম্পর্ক না থাকলেও বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া ও কনটেইনার ভাড়া বেড়ে গেছে। যুদ্ধ না থামলে এই পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। কারণ, জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে হরমুজ প্রণালির বিকল্প নেই। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বেশির ভাগই চলাচল করে লোহিত সাগর হয়ে। কিন্তু সেখানে হুথি বিদ্রোহীদের প্রভাব রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে হুথিরা ইরানের পক্ষ নিয়েছে। যদিও তারা এখনো লোহিত সাগরে কৌশলগত কোনো অবস্থান নেয়নি। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ রুটটিকেও নিরাপদ ভাবছেন না কেউ। তাই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে যুদ্ধ থামানোর বিকল্প নেই।
তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, শুধু অর্ডার হ্রাস পাওয়া ও জাহাজ ভাড়া বাড়াই নয়, দেশের ভেতরেও উৎপাদন খরচ বাড়ছে হুহু করে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি মাসের প্রথমার্ধে গড়ে ঢাকায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা, চট্টগ্রামে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা এবং অন্যান্য এলাকায় আট থেকে নয় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই সময় জেনারেটরে কারখানা চালু রাখার তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অলস পড়ে থাকছে কারখানা।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে পরিবহন ভাড়া বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা কিংবা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এক কাভার্ড ভ্যান পণ্য আনা-নেওয়া করতে খরচ হতো ২৪ থেকে ২৬ হাজার টাকা। খোলা ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে। এখন ৩০ হাজারের নিচে খোলা ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। কাভার্ড ভ্যান ভাড়া হাঁকাচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা। আর কনটেইনারবাহী লরির ভাড়াও বেড়েছে দ্বিগুণ।
বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, অভ্যন্তরীণ খরচ ও জাহাজীকরণের খরচ বাড়ার পাশাপাশি বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে লিড টাইম মেইনটেইন করা। কারণ আমাদের রপ্তানি পণ্যের ৪০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এই আমদানি পণ্য সময়মতো আসছে না। শিপিং লাইনগুলো কোনো টাইমফ্রেম দিচ্ছে না। ফলে অনেক অর্ডার সময়মতো জাহাজীকরণ করা যাচ্ছে না। এতে বায়ার ডিসকাউন্ট অফার করছে অথবা এয়ার শিপমেন্টের জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু এই চাপ সহ্য মতো ক্ষমতা বাংলাদেশের কোনো গার্মেন্ট মালিকদের নেই।
তিনি আরো বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় আমরা বিজিএমইএর পক্ষ থেকে একাধিকবার সরকারের সঙ্গে বসেছি। সফট লোনসহ নীতিগত সহায়তার আবেদন জানিয়েছি। ঈদের আগে সামান্য কিছু টাকা সফট লোনের ব্যবস্থা সরকার করেছে। এই সেক্টর টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে আরো বেশি উদার হয়ে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এডি/এমবি