১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে কেশবপুর, যশোর ও ঢাকায় মিলাদ মাহফিল ও দোয়া
গরীব-দুঃখীর প্রাণের মানুষ, কেশবপুরের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী এরশাদ আলীর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কেশবপুর, যশোর ও ঢাকায় পারিবারিক উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি তিনি নিভৃতে ইন্তেকাল করেন। সময়ের ব্যবধানে উনিশ বছর পেরিয়ে গেলেও কেশবপুরবাসীর হৃদয়ে তার স্মৃতি আজও সমান উজ্জ্বল।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার বাদ আসর কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। তার নিজ বাসভবনে আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে পরিবার-পরিজন, রাজনৈতিক সহকর্মী, শিক্ষাবিদ, আলেম-ওলামা ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। একইভাবে যশোর শহর ও রাজধানী ঢাকায় পারিবারিকভাবে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
১৯৭৯ সালে তিনি যশোর-৬ (তৎকালীন ৯০ যশোর-০৬) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে তার বিজয় ছিল ঐতিহাসিক। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই আসনে তার মতো জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আর কেউ অর্জন করতে পারেননি বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
রাজনীতিতে তিনি ছিলেন ভিন্নধর্মী। ক্ষমতার বলয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছেন। কেশবপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের অংশ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দরিদ্র কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে তিনি ছিলেন সহজলভ্য। তার কাছে দল-মত নির্বিশেষে সবাই সমান গুরুত্ব পেতেন।
তার সময়ে কেশবপুরে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কারে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তিনি উদ্যোগী ছিলেন। রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্থানীয়রা জানান, তার প্রচেষ্টায় কেশবপুর একটি সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে পরিচিতি পায়।
“গাজীর মোড়” নামটি আজও কেশবপুরের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। যদিও প্রশাসনিক নথিতে এর ভিন্ন নাম থাকতে পারে, তবুও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতিতে জায়গাটি তার নামেই পরিচিত। এলাকাবাসীর মতে, এটি তার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততার প্রমাণ বহন করে।
মিলাদ মাহফিলে বক্তারা বলেন, গাজী এরশাদ আলী ছিলেন নিরহংকার, সদালাপী ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ এক জননেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন—সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তিনি সৌজন্য ও সহনশীল আচরণ বজায় রাখতেন। তার এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও অনুকরণীয় বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গাজী এরশাদ আলীর আদর্শ ও কর্মধারা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তারা বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। তার জীবদ্দশায় যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, সেগুলোর উন্নয়নেও পরিবার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
দোয়া মাহফিলে উপস্থিত মুসল্লিরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে আয়োজিত এই মাহফিলে বিশেষভাবে কোরআনখানি ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্মে। গাজী এরশাদ আলীর কর্ম ও অবদান কেশবপুরবাসীর হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজসেবীরা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের উচিত তার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া—বিশেষ করে সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানবিক আচরণের ক্ষেত্রে। তারা উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণে কাজ করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, গাজী এরশাদ আলী ২০০৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে কেশবপুরবাসী এক জনপ্রিয় ও জনমুখী নেতাকে হারায়। তবে সময়ের স্রোত তার শারীরিক উপস্থিতি মুছে দিলেও তার কর্ম ও আদর্শ এখনো মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।
১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত দোয়া ও মিলাদ মাহফিল প্রমাণ করে—গাজী এরশাদ আলী কেবল একটি নাম নন, তিনি কেশবপুরের মানুষের ভালোবাসা, আস্থা ও স্মৃতির অংশ হয়ে আছেন। তার প্রতি এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।