বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সক্রিয় উপস্থিতির ফলে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব থাকছে না। সদ্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক এক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে দেশে তৈরি পোশাক মার্কিন বাজারে রপ্তানি করলে শূন্য শুল্কসুবিধা দেওয়া হবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অনেকাংশে ভারতীয় তুলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভারত থেকে তুলা এনে সুতা ও কাপড় তৈরি করে তা পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি করা হতো। নতুন চুক্তির ফলে ভারত থেকে তুলা আমদানির নির্ভরতা কমবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তিতে উভয় দেশের রপ্তানিকারকরা অসাধারণ সুবিধা পাবেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উৎপন্ন পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে না।
রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। এতদিন ভারতসহ বিভিন্ন তৃতীয় দেশ থেকে তুলা সংগ্রহ করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলেও নতুন ব্যবস্থায় কাঁচামাল সরাসরি আমেরিকা থেকে আমদানি করে সেই বাজারেই শুল্ক ছাড়ে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলো। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হবে একটি কৌশলগত সমন্বয়, যা দেশের বস্ত্র খাতকে লাভবান করবে।
টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, ভারতীয় তুলা আগে আমাদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে রপ্তানি নীতি বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় আমরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছি। এখন মিলগুলো নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের প্রয়োজন অনুভব করছিল। এই চুক্তির ফলে আধিপত্যবাদী ভারত সরকারের আকস্মিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, কোটা আরোপ ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যাবে। পাশাপাশি তুলার গুণগত মান দুর্বল এবং দামের অস্থিরতাও ভারতীয় তুলা আমদানি কমাতে মিল মালিকরা আগ্রহী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তুলা আমদানিতে ভারতীয় বাজারের অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী দেশ। তবে ধারাবাহিক নীতিগত অনিশ্চয়তা, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, মানসংক্রান্ত অভিযোগ ও দামের অস্থিরতার কারণে গত বছর ২০২৫ সালে সেই অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে। এক বছরে ভারত থেকে তুলা আমদানি কমেছে ২১ শতাংশের বেশি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতীয় তুলা সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মিল মালিকরা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন। এই সুযোগে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের তুলা বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্রাজিল মোট আমদানির ২৭ শতাংশ সরবরাহ করে ভারতকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছর ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে মোট তুলা আমদানির প্রায় এক-দশমাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। নতুন চুক্তির ফলে এই অংশ আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতদিন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ভারতীয় তুলা ও সুতার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। নিট পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতার বড় অংশই আসত ভারত থেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, যার মধ্যে নিট পণ্যের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য এটি সতর্কবার্তা। আঞ্চলিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সহযোগিতার দিকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে তাদের।