ওষুধের দাম নির্ধারণে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল অংশীজন হলেও কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ ও দাম বেঁধে দিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি)।
শনিবার দুপুরে গাজীপুরের একটি হোটেলে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি) ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি: প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় বাপির নেতারা এসব কথা বলেন।
সমিতির নেতারা বলছেন, এই একতরফা সিদ্ধান্তে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে; যা দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ সরবরাহ ও শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাপির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বাপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান, বিএইচআরএফের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।
মূল প্রবন্ধে ডা. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাড়ানো এবং সেগুলোর দাম নির্ধারণ—দুটিই অত্যন্ত কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অথচ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসেনি। এমনকি শিল্পের সংগঠন হিসেবে বাপির সঙ্গেও কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু দাম নির্ধারণ যদি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনা না করে করা হয়; তাহলে সেই সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।’
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বাপি মহাসচিব বলেন, গত আট থেকে ৯ মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে সমিতির সঙ্গে কোনো কার্যকর যোগাযোগ নেই। উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী বা সচিব পর্যায়ের কেউই সমিতির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেননি। এমনকি ওষুধ শিল্পসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ কমিটি ও অবজার্ভার তালিকা থেকেও বাপিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়? দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত হয়েও আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না কেন?’
ডা. জাকির হোসেন বলেন, ওষুধের দাম নির্ধারণের জন্য যে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে ওষুধ উৎপাদন বা ওষুধ ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন কাউকে রাখা হয়নি।
তার ভাষ্য, ‘যারা কখনো ওষুধ বানায়নি, যারা কখনো এই শিল্পের ভেতরে কাজ করেনি; তারা কীভাবে ওষুধের কারিগরি বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে?’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যেমন একজন সাংবাদিকই মিডিয়ার ভেতরের সমস্যা সবচেয়ে ভালো বোঝেন, তেমনি ওষুধ শিল্পের জটিল কারিগরি দিক বাইরের লোক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
ডব্লিউএইচওর গাইডলাইনের কথা উল্লেখ করে শিল্প প্রতিনিধিদের ডাকা হচ্ছে না—এই যুক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি। ডা. জাকির বলেন, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা বলে যাদের ওপর বাস্তবায়নের দায়িত্ব, তাদের মতামতই যদি না নেওয়া হয়; তাহলে নীতিমালা বাস্তবসম্মত হয় না। পরে তারা স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিতভাবে তাদের যুক্তি ও প্রস্তাব জমা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ওষুধ শিল্পের স্বচ্ছতা ও নজরদারি প্রসঙ্গে ডা. জাকির হোসেন বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নারকোটিক্সসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ১৪ বার রিপোর্ট দিতে হয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ইটিপি মনিটরিংয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যার সংযোগ সরাসরি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত এবং তা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। তার ভাষ্য, ‘ভুল তথ্য দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সেটা চাইও না।’
মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, ওষুধ কারখানায় কাজ করা অফিসার পর্যায়ের সবাই গ্র্যাজুয়েট বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এমনকি ফিল্ড লেভেলের কর্মীদেরও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়। ফ্যাক্টরির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (এইচভিএসি সিস্টেম) কাজ করতে হয়। কর্মীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, জুতা ও নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ বাধ্যতামূলক।
প্রধান অতিথি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে। গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ কোম্পানি রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ওষুধের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাপি সভাপতি বলেন, দেশের ওষুধ শিল্পের প্রকৃত শক্তি কখনোই কেবল বড় কয়েকটি কোম্পানি ছিল না; বরং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোই এই শিল্পের চালিকাশক্তি। অথচ বর্তমানে সেই ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ছে।
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, তালিকাভুক্ত প্রায় ১০০টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। বাকি কোম্পানিগুলো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ৫০ নম্বর থেকে ১০০ নম্বর অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। তাদের অনেককে গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে একই দামে ওষুধ বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালে যে দামে ওষুধ বিক্রি হতো, ২০২৫-২৬ সালেও সরকার সেই দাম বাড়াতে দিচ্ছে না। অথচ উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের দাম, শ্রম ব্যয়—সবকিছুই বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব।’
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বোঝাতে তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে এক সময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ভেনেজুয়েলা তার বাস্তব উদাহরণ। একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও অদক্ষ ও অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে এর প্রভাব যে শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সে বিষয়েও সতর্ক করেন আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘এসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে বড় কোম্পানিগুলো দেশের বাজারের চেয়ে রপ্তানিতে বেশি মনোযোগ দেবে। তখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের প্রাপ্যতা, দাম ও মান—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এই রুগ্ণ কোম্পানিগুলোকে এখনই টেনে তুলতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ওষুধ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।’
সাংবাদিকদের সহায়তা চেয়ে বাপি সভাপতি জানান, তারা যেন এই রুগ্ণ কোম্পানিগুলোর বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি সরকারের প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই সরকার এই ৬০ শতাংশ কোম্পানির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর নীতি সহায়তা দিক। ওষুধ শিল্পকে আবার ১৯৯৪ সালের ধারায় ফিরিয়ে আনুক।’