হোম > বাণিজ্য > শিল্প

মুখোমুখি অবস্থানে বস্ত্রকল ও পোশাকশিল্প মালিকরা

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা

সোহেল রহমান

দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভারত থেকে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে প্রত্যাহারের এ উদ্যোগে মুখোমুখি অবস্থানে দেশের দুই শীর্ষ খাত বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে শীর্ষ রপ্তানিমুখী আরএমজি শিল্প গভীর সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। অন্যদিকে বস্ত্রকল মালিকরা মনে করছেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হলে দেশীয় সুতা উৎপাদন শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতারা বলছেন, এ সুবিধা বাতিল হলে তৈরি পোশাকশিল্প সংকটে পড়বে। সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামালে ব্যয় বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিরাট ঘাটতি তৈরি করবে।

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা বলছেন, শুল্কমুক্ত আমদানির বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করা না হলে সুতা উৎপাদনে দেশীয় শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে দেশীয় প্রায় ৫০টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, বিটিএমএর গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা ১০ ও ৩০ কাউন্টের বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়েছে। যদিও এনবিআর গতকাল সোমবার পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। তবে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার ও বহাল রাখার দাবিতে মুখোমুখি অবস্থানে আছেন বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় নির্দিষ্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাতিলের জন্য এনবিআরকে সুপারিশ করা হয়েছে। সুতা উৎপাদনে দেশীয় কারখানা বন্ধ হলে ভবিষ্যতে নিট পোশাক খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। এতে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে। তবে বন্ড সুবিধা থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এনবিআরের।

এদিকে, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সোমবার তৈরি পোশাকশিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে। সংগঠন দুটি জানায়, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি আদেশ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর।

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মতো ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ যখন আমাদের শিল্পকে কোণঠাসা করছে, ঠিক তখনই সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে এসেছে। যদিও আমরা পোশাক রপ্তানিকারকরাই বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা, তারপরও এরকম একটি স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের স্বার্থকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলার মধ্যেই আমাদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ডিসেম্বর মাসে তা ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। এর ওপর উচ্চ দামে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেবেন, যা প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তিনি আরো বলেন, বস্ত্র খাতকে সহায়তা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক বসানোর পরিবর্তে সরাসরি নগদ সহায়তা, বিশেষ প্রণোদনা, করপোরেট করছাড়, স্বল্প সুদে ঋণ এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, শুল্কমুক্ত আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছের। অর্ডার কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি টেক্সটাইল মিল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য তুলে ধরে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সুতা আমদানি করেছে। আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। সে দেশের সরকার রপ্তানিতে ভর্তুকি দেওয়ায় তাদের রপ্তানিকারকরা ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৩০ ডলার কম দামে বাংলাদেশে সুতা বিক্রি করতে পারছেন।

বাজার বিশ্লেষকরা জানান, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার দর কেজিতে ২ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৭৫ ডলার। আর আমদানি করা ভারতীয় সুতার দাম পড়ছে ২ দশমিক ৫৫ থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।

ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভাঙল অতীতের রেকর্ড

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণে মতামত না নেওয়ার অভিযোগ