জুলাই গণহত্যা এবং ২০১৩ সালের হেফাজত গণহত্যার ঘটনায় পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েক ডজন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে । মামলাগুলোর প্রায় সব আলামত ও ডকুমেন্ট ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার হাতে এসেছে। কিছুদিনের মধ্যে অন্তত তিনটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরুর পর প্রায় চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গত ১৪ অক্টোবর কাজ শুরু করে। সেপ্টেম্বরে পুনর্গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল এবং তদন্ত সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, জুলাই ও হেফাজত গণহত্যায় শেখ হাসিনাকে প্রধান অভিযুক্ত করে কয়েক ডজন আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এ মামলাগুলোর প্রায় সব ডকুমেন্ট ইতোমধ্যে তদন্তকারীদের হাতে এসেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, হতাহতদের তালিকা প্রণয়ন, আহত-প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা, ঘটনাস্থলে অবস্থানকারী সাংবাদিক বিশেষ করে টিভি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত বহু তথ্য-প্রমাণের ফুটেজ, ছবি ইতোমধ্যে তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। এখন চলছে এগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং আনুষঙ্গিক আইনগত বিষয়গুলোর পুনঃপরীক্ষার নিরিখে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ।
চার মাসে তিন শতাধিক অভিযোগ
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম আমার দেশকে বলেন, ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পেয়ে আসছি। তার মধ্যে তিন শতাধিক অভিযোগ আমলে নিয়েছি। ট্রাইব্যুনালের অতিক্রান্ত প্রায় চার মাসে এ পর্যন্ত ১৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিটি মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী এসব অপরাধে জড়িত অধিকাংশ আসামি পালিয়ে গেলেও ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত যে ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৫ জনই সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও শেখ হাসিনার উপদেষ্টা। তারা হলেন আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, ফারুক খান, শাজাহান খান, আবদুর রাজ্জাক, দীপু মনি, গোলাম দস্তগীর গাজী, কামরুল ইসলাম, জুনাইদ আহমেদ পলক, কামাল আহমেদ মজুমদার ও চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী ।
মানবতাবিরোধী এসব মামলায় গ্রেপ্তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক সদস্য আছেন ১৮ জন। তারা হলেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, মহিউদ্দিন ফারুকী, জসিম উদ্দিন মোল্লা, আবদুল্লাহিল কাফী, মইনুল ইসলাম, আলেপ উদ্দিন, মো. শাহিদুল ইসলাম, যাত্রাবাড়ী এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার তানজিল আহমেদ, যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ওসি মুজিবুর রহমান, মো. মাজহারুল ইসলাম, মো. আরাফাত হোসেন, পুলিশ ইন্সপেক্টর সদস্য মোহাম্মদ আরশাদ হোসেন, চঞ্চল চন্দ্র সরকার, মোহাম্মদ সুজন হোসেন, আশুলিয়ায় ছাত্রদের পুড়িয়ে মারায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য মুকুল চোকদার, হোসেন আলী ও আকরাম। এছাড়া রয়েছেন সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম।
চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আইসিটির কো-অর্ডিনেটর পুলিশ কর্মকর্তা শহিদুল্যাহ চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, হেফাজত-জুলাই গণহত্যাসহ কয়েকটি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় অনেক দূর এগিয়ে গেছি। ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত, ফরেনসিক ডকুমেন্টস নেওয়া হয়েছে। চলছে এগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত ২৮০ জন সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে যারা রাতদিন পরিশ্রম করছেন। গণহত্যায় জড়িত এসব অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তবে বিগত হাসিনা সরকারের ভয়ে যারা বহু তথ্য-উপাত্ত কোথাও দিতে পারেননি, তারাও এখন সংস্থার কাছে জমা দিচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
গত ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা, বেনজীর আহমেদসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে হেফাজতের পক্ষে পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। একটি অভিযোগ হেফাজতে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হক এবং আরেকটি অভিযোগ করেন মুফতি হারুন ইজহার। উল্লেখ্য, ২০১৩-এর ৫ এবং ৬ মে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হয়।
পরবর্তীকালে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ওয়েবসাইটে নিহতদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। এ তালিকা প্রকাশের অভিযোগে অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান এবং পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিনকে গ্রেপ্তার জেল-জরিমানা করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে হেফাজতের এ গণহত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন, শেখ ফজলে নূর তাপস, হাছান মাহমুদ, হাজী সেলিম, সালমান এফ রহমান, শামীম ওসমান, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, এ কে এম শহীদুল হক, হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, তুরিন আফরোজ, ইমরান এইচ সরকার, একাত্তর টিভির মোজাম্মেল হক বাবু, সময় টিভির আহমেদ জোবায়ের, এবিনিউজ২৪ ডটকমের সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, নাইমুল ইসলাম খান, আজিজ আহমেদ এবং মো. মনজুর আহমেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা সূত্র জানায়, নৃশংস এ গণহত্যায় জড়িত শেখ হাসিনা, বেনজীরসহ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কয়েকডজন নেতার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে কিছুদিনের মধ্যেই।