নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় ব্যাপকভাবে ধর্মদ্রোহের সূচনা হয়নি। কিন্তু তিনি এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বেশ কিছু হাদিসে উম্মতকে ধর্মত্যাগের ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং এর ভয়াবহতা পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। তার যুগে সীমিত পরিসরে ধর্মদ্রোহের আবির্ভাব ঘটেছিল। মুসাইলামা, আসওয়াদ আনসীর মতো কয়েকজন নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারদের উদ্ভব ঘটেছিল। নবীজি (সা.) নিজে কোনো ক্ষেত্রে ধর্মদ্রোহীদের মোকাবিলা করেছিলেন এবং যে ধর্মত্যাগীদের মধ্যে যারা নবীজি (সা.)-কে কটূক্তি করেছিল বা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল, তাদের তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেমন : আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল।
তবে নবীজির ইন্তেকালের পরে মিথ্যা নবুয়ত দাবিদার ও জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে বৃহত্তর ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল, সেগুলো পরিচালনা ও সম্পন্ন করেছিলেন আবু বকর (রা.)।
নবীযুগের কয়েকজন ধর্মদ্রোহী
নবীজি (সা.)-এর যুগে কয়েকজন লোক ধর্মদ্রোহ ঘোষণা করেছিল।
এক. উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ
উবাইদুল্লাহ বিন জাহাশ ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু আসাদ গোত্রের সন্তান। তার মা ছিলেন নবীজির ফুপু উমাইমা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি ও ইসলামের প্রথম পতাকাবাহী আবদুল্লাহ বিন জাহাশ (রা.)-এর ভাই।
মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচার যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার নির্দেশ দেন। উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ স্ত্রী উম্মে হাবিবা (রা.)-কে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ায় চলে আসেন। আবিসিনিয়ায় পৌঁছানোর কিছুকাল পর তার জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। মদ্যপান ও আভিজাত্যের মোহে তিনি ইসলামের পথ ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যান।
ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) বলেন, এ ব্যাপারে সব মুসলিম ইতিহাসবেত্তারা একমত—উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ সস্ত্রীক হাবশায় হিজরত করেন এবং সেখানে গিয়ে খ্রিষ্টান হয়ে মারা যান।
দুই. উরাইনা গোত্রের কয়েকজন
ইসলামের ইতিহাসে উরাইনা গোত্রের ঘটনা বেশ আলোচিত ও প্রসিদ্ধ। হিজরি ষষ্ঠ সনে আরবের ‘উকল’ এবং ‘উরাইনা’ গোত্রের আটজন লোক মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনার আবহাওয়া তাদের অনুকূলে ছিল না। ফলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের মদিনার অদূরে, যেখানে জাকাতের উট চরে বেড়াত, সেখানে যেতে বলেন এবং তাদের সুস্থতার জন্য পথ্য হিসেবে উটের দুধ ও পেশাব পান করার পরামর্শ দেন।
কিছুদিন সেখানে অবস্থান করার পর তারা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং চরম অকৃতজ্ঞতা ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয়। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাখাল ইয়াসার (রা.)-কে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার হাত-পা কেটে ফেলে এবং চোখে গরম শলাকা ঢুকিয়ে দেয়। এরপর জাকাতের উটগুলো লুট করে পালিয়ে যায়। তারা ইসলাম ত্যাগ করে আবার কাফের হয়ে যায়।
ঘটনা জানার পর, রাসুলুল্লাহ (সা.) ২০ সাহাবির একটি দল পাঠান। তারা অপরাধীদের ধরে পাকড়াও করে মদিনায় নিয়ে আসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেন।
তিন. আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ
আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ একদিকে যেমন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৌ-সেনাপতি এবং মিসর বিজয়ের নায়ক, অন্যদিকে তিনি সেই বিরল ব্যক্তিদের একজন—যিনি ইসলাম গ্রহণের পর শয়তানের প্ররোচনায় মুরতাদ হয়েছিলেন এবং আবার ইসলামে ফিরে এসে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে আমৃত্যু দ্বীনের খিদমত করেছেন।
তিনি ছিলেন তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর দুধ ভাই। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং শিক্ষিত হওয়ার সুবাদে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওহি লেখক হিসেবে নিযুক্ত হন।
ইসলাম ত্যাগের ফলে মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার রক্ত বৈধ ঘোষণা করেন। পরে উসমান (রা.) তার জন্য নিরাপত্তা চাইলে নবী (সা.) তাকে নিরাপত্তা দেন। এরপর তিনি নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার ইসলাম গ্রহণ ছিল সুন্দর ও সুদৃঢ়।
পরে জীবনে তিনি ইসলামের পক্ষে অনেক কীর্তি অর্জন করেছিলেন।