সময়টা ২০১২, বিখ্যাত কিশোর থ্রিলার ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের জনক রকিব হাসান ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছিলেন মাসিক ‘রহমত’-এ। ফেব্রুয়ারি মোতাবেক রবিউল আউয়াল সংখ্যায় মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যার সিদ্ধান্ত হলো। নিয়মিত বিভাগ বন্ধ থাকবে। রকিব হাসান কী লিখবেন? সম্পাদক মনযুর আহমাদসহ গেলাম রকিব হাসানের বাসায়। বললাম, নবীজিকে নিয়ে লিখতে। কখনো লেখেননি, তাই প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না; বললেন, নবীজীবন নিয়ে খুব বেশি জানা নেই। আমরা সিরাতের বই সংগ্রহ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আশ্বস্ত হলেন। সময় নিলেন। পড়লেন। লিখলেন। তারপর সিরাতুন্নবী সংখ্যায় ছাপা হলো রকিব হাসানের একমাত্র নবীগদ্যটি।
ভূমিকায় পাঠকের উদ্দেশে লিখলেন—
প্রিয় পাঠক, এতদিন শুধু রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার, সায়েন্স ফিকশন আর ভূতের গল্প লিখেছি। মাসিক ‘রহমত’ পত্রিকাতেও ধারাবাহিকভাবে রহস্যকাহিনি ছাপা হচ্ছে।
‘রহমত’-এর সম্পাদক মনযুর আহমাদ জানালেন, জানুয়ারি (মূলত ফেব্রুয়ারি) সংখ্যায় রহস্যকাহিনি ছাপা হবে না, কারণ ‘সিরাতুন্নবী’ সংখ্যা প্রকাশিত হবে। যেহেতু ধারাবাহিক লেখাটা বন্ধ থাকছে, তাই এ সংখ্যায় আমাকে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে লেখার অনুরোধ করলেন। থমকে গেলাম। আমি কি পারব? দ্বিধাদ্বন্দ্ব করতে করতে শেষে সাহস করে লিখেই ফেললাম। মহানবী (সা.)-কে নিয়ে এটাই আমার প্রথম লেখা। ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। তাই আমার এই লেখাটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে বাধিত হব। আপনাদের সহযোগিতা ও উৎসাহ পেলে অবশ্যই আমাদের প্রিয় নবীকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরো লেখার প্রেরণা পাব।
ইসলাম-পূর্ব সময়ে এক ভয়ংকর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল যেন আরবরা। সমগ্র আরবে চলছিল ভয়াবহ অরাজকতা। গোত্রে গোত্রে শত্রুতা। সারাক্ষণ একে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টায় রত। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি ও মারামারি থেকে শুরু করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া; বছরের পর বছর ধরে সেই যুদ্ধ চলা।
কত তুচ্ছ ঘটনা থেকে যুদ্ধের সূত্রপাত হতো, তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একদিন এক বিদেশি পথিক ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর হয়ে বসুস নামে এক বুড়ির মেহমান হলো। পথিকের উটটা গা চুলকানোর জন্য কুলায়ব নামে এক লোকের বাগানে ঢুকে একটা গাছের সঙ্গে গা ঘষতে লাগল। তাতে গাছের ওপরের একটা পাখির বাসা থেকে একটা ডিম মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। পাখির চিৎকারে কী হয়েছে দেখতে এসে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তীর মেরে উটটাকে জখম করল কুলায়ব, আর চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘কার এত বড় সাহস যে আমার আশ্রিত পাখির ডিম ভেঙে পাখিকে কষ্ট দেয়?’
বসুসও কম যায় না। সেও সমান তেজে জবাব দিল, ‘আমার মেহমানের উটকে জখম করে তাকে অপমানিত করে আমাকেও অপমান করা হয়েছে। আমি অবলা নারী। দুনিয়ায় আপন বলতে আমার কেউ নেই। আমার এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার মতো কোনো পুরুষ মানুষ কি নেই?’
বুড়ির কথা শুনে রেগে গেল তার এক আত্মীয়। সে এসে কুলায়বকে মেরেই ফেলল। ব্যস, শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, কারণ কুলায়ব আর বুড়ির আত্মীয় দুজন দুই গোত্রের লোক। একজন বনু বকর গোত্রের, অন্যজন বনু তাগলব গোত্রের। আশি বছর ধরে চলল এই বিবাদ। সামান্য কারণে এমন বিবাদ আরো বহু সংঘটিত হয়েছে তৎকালীন আরবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলতে তখন কিছুই ছিল না সেখানে। আরবের বেশিরভাগ গোত্রের মানুষই লুটতরাজ আর চুরি করে জীবিকা নির্বাহ করত। সুযোগ পেলেই এক গোত্র আরেক গোত্রের ধন-সম্পদ, গৃহপালিত পশু, এমনকি মেয়েদেরকেও লুট করে নিয়ে যেত, তারপর সেসব মেয়েদের হয় নিজেরা বিয়ে করত, কিংবা দাসী-বাঁদি হিসেবে বিক্রি করে দিত।
ডাকাতরা বনে-জঙ্গলে, পর্বতের গুহায় লুকিয়ে থাকত। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিরীহ পথিক ও ব্যবসায়ীদের কাফেলা আক্রমণ করে তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিত, তাদের খুন করে লাশ ফেলে রাখত শিয়াল-শকুনে খাওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে যে যত বড় ডাকাত, সে তত বড় বীর-বাহাদুর বলে বিবেচিত হতো।
অনাচার করতে করতে তাদের অন্তর হয়ে গিয়েছিল ভয়ানক নিষ্ঠুর ও মায়ামমতাহীন। জ্যান্ত উট কিংবা দুম্বার গা থেকে মাংস কেটে নিয়ে কাবাব বানিয়ে খেত। বেচারা অসহায় প্রাণীগুলো যন্ত্রণায় ছটফট করে রক্তপাতে মারা যেত, তাতে ভ্রুক্ষেপও করত না ওই আরবরা। জ্যান্ত পশুকে গাছে বেঁধে তার ওপর তীর ছোড়ার চর্চা করত। যুদ্ধে বন্দি অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের পেট কেটে বাচ্চা বের করে মেরে ফেলত। শত্রুকে ভয়ানক শাস্তি দিতে নানারকম নিষ্ঠুর উপায় বের করত। দুটো চারা গাছ বাঁকিয়ে এনে দুপাশে শত্রুর দুই পা বেঁধে আচমকা গাছ দুটোকে ছেড়ে দিত। গাছ দুটো জোরে সোজা হওয়ার সময় এমন টান লাগত শত্রুর দেহটা দুই পায়ের মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গিয়ে দুই ভাগ হয়ে যেত। মানবদেহের সেসব খণ্ডাংশ গাছেই ঝুলে থাকত, পচে গিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত। মেয়েদের শাস্তি দিতে হলে তার পা ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে পাথুরে জায়গার ওপর ছুটিয়ে দিত। অসহ্য যন্ত্রণা পেয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মারা যেত সেসব মেয়ে। ধনী লোককে কবর দেওয়ার পর তার কবরের পাশে উট বেঁধে রাখত। খাবার-পানি না পেয়ে তিলে তিলে ওখানেই মারা যেত উটটা। লোকের বিশ্বাস ছিল পরকালে এই উট মৃত লোকটার বাহন হবে। ব্যভিচার আর মেয়েদের প্রতি অন্যায় করার প্রবণতা ঢুকে গিয়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ব্যভিচার করাকে হারাম ভাবা তো দূরের কথা, সেটাকে গোপন না করে বরং গর্ব করে প্রচার করত। কাউকে ধর্ষণের পর প্রকাশ্য সভায় নিজের বদমায়েশিকে ফলাও করে বর্ণনা করে আত্মতৃপ্তি লাভ করত। কিন্দা রাজ্যের যুবরাজ ইমরুল কায়েস কিন্দিকে তৎকালীন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মনে করা হতো। সে তার ফুফাতো বোন ও অন্যান্য যেসব মহিলার সঙ্গে কুকর্ম করেছে, সেগুলো তার নিজের রচিত ‘কাসিদায়ে লামিয়া’ কবিতায় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। গভীর রাতে দারোয়ানের চোখে ধুলো দিয়ে কীভাবে ঘরে ঢুকে কাকে ধর্ষণ করেছে, কোথায় বিবস্ত্র হয়ে গোসলরত মেয়েদের কাপড়চোপড় নিয়ে গাছে উঠে বসে থেকেছে, উলঙ্গ যুবতী মেয়েরা তার কাছ থেকে কীভাবে কাপড়গুলো উদ্ধার করেছে, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে থাকা মা কিংবা গর্ভবতী মহিলারা তার ইশারায় কীভাবে নিজেদের তার কাছে বিলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, এসব কাহিনি বিস্তারিত লেখা রয়েছে তার কবিতায়। আরবের তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের কবিতা প্রতিযোগিতায় এই কবিতাটি প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। কবির সম্মানে তাই কবিতাটি পবিত্র কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। লোকে এই কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ পেত।
সেই ভয়ংকর অন্ধকার যুগে মেয়েরা ছিল চরম অসহায়, অবহেলা, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার শিকার, যা ইচ্ছে করা হতো তাদের নিয়ে। বিয়ের স্বাভাবিক প্রচলিত নিয়ম ছাড়াও আর কয়েক ধরনের অস্বাভাবিক বিবাহপ্রথা চালু ছিল। যেমন, স্বাস্থ্যবান সন্তান লাভের আশায় স্বামী তার নিজের স্ত্রীকে কোনো বলিষ্ঠ পুরুষের সঙ্গে দৈহিক মিলনের অনুমতি দিত। এই অনুমতিকে ‘বিয়ে’ বলা হতো। ওই স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা না হওয়া পর্যন্ত এ বিয়ে স্থায়ী হতো।
আবার মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হলে তাকে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে দৈহিক মিলনের অনুমতি দেওয়া হতো। নিয়ম ছিল এই যুবকদের সংখ্যা দশজনের বেশি হতে পারবে না। মিলিত হওয়ার পর মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসব করলে সেই যুবকদের ডেকে আনা হতো। মেয়েটি যে যুবককে তার সন্তানের পিতা বলে চিহ্নিত করত, সে পিতা হোক বা না হোক, তার সঙ্গেই মেয়েটির বিয়ে দেওয়া হতো। এটাও এক ধরনের বিয়ে।
আরেক ধরনের বিয়ে ছিল পতিতার সঙ্গে বিয়ে। কোনো পতিতার বাচ্চা হলে সেই বাচ্চার চেহারার সঙ্গে যে পুরুষ মানুষের মিল থাকত, তাকেই শিশুর বাবা বলে চিহ্নিত করা হতো, লোকটা তখন ওই পতিতাকে বিয়ে করতে বাধ্য হতো। আর এই চিহ্নিত করার কাজটা যে করত, তাকে বলা হতো কিয়াফা-শেনাস।
এই অসভ্য আরবরাও কাবাঘরকে পবিত্র বিবেচনা করে হজ করাকে পুণ্যের কাজ বলে মনে করত। লজ্জা বলতে কিছু ছিল না ওদের। একমাত্র কুরায়িশ বংশীয়রা ছাড়া বাকি সবাই উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করত। মহিলারাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। খোলা জায়গায় উলঙ্গ হয়ে গোসল করত এইসব লোকেরা। পিতার মৃত্যুর পর সৎমাকে জোর করে বিয়ে করত। যুদ্ধে পরাজিত শত্রুপক্ষের মেয়েদের ধর্ষণ করত। সেই বিবরণ আবার কবিতা লিখে গর্বের সঙ্গে পাঠও করত।
কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে জন্মের পরপরই তাকে মেরে ফেলত তার বাবা, বিশেষ করে যারা খুব গরিব ছিল। মেয়েকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। তাদের যুক্তি ছিল, এসব ঝঞ্ঝাট বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। জ্যান্ত দাফন করে আল্লাহর জিনিস আল্লাহর কাছে ফেরত পাঠানোই ভালো।
মেয়েসন্তানকে হত্যা করতে গিয়ে কেউ কেউ আরো ভয়ংকর কাণ্ড করত। মেয়ে ছয় বছর বয়সি হলে বাবা গিয়ে নির্জন মাঠে একটা গর্ত খুঁড়ে রেখে আসত। বাড়ি এসে স্ত্রীকে বলত, ‘মেয়েকে ভালো জামাকাপড় পরিয়ে দাও। ওকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাব।’ সাজিয়ে-গুছিয়ে সেই মেয়েকে নিয়ে গিয়ে গর্তের পাড়ে দাঁড়াত বাবা; বলত, ‘দেখ্ তো মা, এই কুয়ার ভেতর কী আছে?’ মেয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে গেলে পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে মাটি দিয়ে গর্তটা ভরাট করে দিত বাবা।
কায়েস বিন আসিম নামে এক লোক মুসলমান হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে স্বীকার করেছিল, এভাবে সে তার আটটা মেয়েকে গর্তে ফেলে মেরেছে। কথিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) লোকটাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এসব করতে তোমার মায়া লাগত না?’ লোকটা জবাব দিয়েছিল, ‘হ্যাঁ, একটা মেয়ের জন্য খারাপ লেগেছিল। আমি যখন তাকে গর্তে ফেলে মাটিচাপা দিচ্ছিলাম, সে তখন হাত বাড়িয়ে আমার দাড়ি ঝাড়তে ঝাড়তে বলেছিল, আব্বা, আপনার দাড়িতে ধুলো লেগেছে। শেষে মায়া করে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে আসি এই ভয়ে তাড়াতাড়ি গর্তটা মাটি দিয়ে ভরে ফেলেছিলাম।’
মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, সুদ খাওয়া—এসব যেন এই বর্বর মানুষগুলোর জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না। হেন অনাচার আর কুকর্ম নেই, যা তারা করত না। আর এই ভয়ানক অন্ধকার যুগেই পৃথিবীতে এসেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
২৪ বছর বয়সে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাবা আবদুল্লাহ বিবি আমেনাকে বিয়ে করেন। আরবের অভিজাত গোত্রের অভিজাত হাশেমি পরিবারের এই বিয়েতে তৎকালীন রীতি অনুযায়ী ধুমধামের কমতি হয়নি। সুখেই দিন কাটাতে লাগলেন নবদম্পতি। কিন্তু বেশিদিন সুখ সইল না বিবি আমেনার কপালে, অল্প বয়সে বিধবা হলেন। তাঁর স্বামী যুবক আবদুল্লাহ মদিনায় ব্যবসার কাজে গিয়ে এমনই অসুস্থ হলেন, আর ফিরে এলেন না; মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন।
প্রাণে প্রচণ্ড ব্যথা পেলেন আবদুল্লাহর বাবা আবদুল মুত্তালিব। মনের কষ্ট কমাতে প্রায়ই তিনি নির্জন মরু-রাতের তারাভরা আকাশের দিকে বিষণ্ণ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। কী ভাবতেন, তিনিই জানেন।
নির্দিষ্ট দিনে মা আমেনার কোল আলো করে জন্ম নিলেন এক পুত্রসন্তান। নাতিকে বুকে জড়িয়ে পুত্রশোক অনেকখানি কাটালেন বৃদ্ধ।
নবজাতককে কোলে নিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করলেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে শিশুকে আবার ফিরিয়ে দিলেন মায়ের কোলে। শিশুর নাম রাখা হলো মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)।
মাত্র কয়েক দিন মায়ের দুধ পান করার পর আরবের সম্ভ্রান্ত পরিবারের প্রথা অনুযায়ী শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে তুলে দেওয়া হলো তায়েফের অধিবাসী সুধন্যা হজরত হালিমা (রা.)-এর হাতে। নিয়ম অনুযায়ী মাঝে মাঝে ছেলেকে দেখানোর জন্য তাঁকে মায়ের কাছে নিয়ে আসতেন হালিমা (রা.)।
হজরত হালিমা (রা.)-এর ঘরে থাকার সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল। দুধভাইদের সঙ্গে তিনিও মাঠে মেষ চরাতে যেতেন। একদিন হঠাৎ মাঠ থেকে তাঁর এক দুধভাই দৌড়ে বাড়ি এসে উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘সাদা পোশাক পরা দুজন লোক এসে আমার কুরায়শ ভাইকে মাটিতে শুইয়ে ফেলে তাঁর পেট কেটে ফেলেছে।’ এ খবর শোনামাত্র ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে হজরত হালিমা (রা.) তাঁর স্বামীকে নিয়ে সেখানে ছুটলেন। এ বিষয়ে পরে হজরত হালিমা (রা.) বলেছেন, ‘আমি আর আমার স্বামী হারিস ভেড়া চরানোর মাঠে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি, মুহাম্মাদ (সা.) ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার স্বামী তাঁকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, বাবা? তিনি জবাব দিলেন, সাদা পোশাক পরা দুজন লোক আমাকে মাটিতে শুইয়ে আমার পেট কেটে কী যেন বের করে ফেলে দিয়েছে। তারপর আমার পেট জোড়া লাগিয়ে যেমন ছিল তেমন করে দিয়েছে।’
যাই হোক, ছয় বছর পর শিশু মুহাম্মদ (সা.) আবার মায়ের কোলে ফিরে এলেন। মরুপ্রান্তরের বেদুইন জীবন ছেড়ে মক্কায় এসে শুরু হলো তাঁর শহুরে জীবন।
কিন্তু মায়ের কাছে থাকার সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। একদিন ছেলেকে নিয়ে স্বামীর কবর জিয়ারত করতে চললেন মা আমেনা। ফেরার পথে দুর্গম মরুভূমিতে ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি; আর সুস্থ হলেন না। নির্জন মরুর বালিতে পড়ে রোগযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পরপারে চলে গেলেন।
বাবা গেছেন, মা গেছেন—নাতির দায়িত্ব নিলেন আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু তিনিও বেশিদিন রইলেন না। প্রিয়তম দাদাও যখন চলে গেলেন, একেবারে অসহায় হয়ে গেলেন বালক মুহাম্মদ (সা.)। কে দায়িত্ব নেবে এই এতিম বালকের? নিলেন চাচা আবু তালিব। আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না তাঁর, তার ওপর বেশ বড় একটি পরিবারের ভরণপোষণ করতে হতো। বিরাট দায়িত্ব। কিন্তু তিনি পিছপা হলেন না। তাঁর হাতেই ব্যবসার হাতেখড়ি হলো মুহাম্মদ (সা.)-এর।
সময় বসে থাকে না। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা আর বুদ্ধিমত্তার জন্য সবাই তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। সততার জন্য তাঁর নামই হয়ে গেল ‘আল-আমিন’।
এ সময় কাবাঘরকে নিয়ে ঘটল একটা বিশেষ ঘটনা। কালের বিবর্তনে ভেঙেচুরে এতই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ল কাবাঘর যে মেরামত করা অনিবার্য হয়ে পড়ল। আর তা করার জন্য কুরাইশদের সব শাখা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিবাদ শুরু হলো হাজরে আসওয়াদ বা ‘কালোপাথর’ পুনঃস্থাপন নিয়ে। কারণ নিজের হাতে এই পাথর স্থাপন করাটা ছিল তাদের কাছে একটা বিরাট গৌরব আর মর্যাদার বিষয়। তাই কুরাইশদের প্রতিটি গোত্র রক্তের পাত্রে হাত ডুবিয়ে শপথ করল, ‘রক্তের শেষ বিন্দু দেব, তবু এ মর্যাদা হাতছাড়া করব না। কালো পাথর শুধু আমাদের হাতেই পুনঃস্থাপিত হবে, আর কারও হাতে নয়।’
ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিল। খুব সহজেই মীমাংসা করে দিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। অথচ বয়সে তিনি তখন একেবারেই তরুণ, কুরাইশদের বহু প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের চেয়ে তাঁর বয়স অনেক কম। একটা চাদর বিছিয়ে নিজের হাতে পাথরটাকে তিনি সেটার ওপর তুলে দিয়ে গোত্রপ্রধানদের ডেকে বললেন, ‘এখন আপনারা একেকজন এসে চাদরের একেক কোনা ধরেন। তারপর পাথরটাকে নিয়ে চলে যান যেখানে নিয়ে যেতে চান।’ নেওয়ার পর আবার তিনি পাথরটাকে তুলে যথাস্থানে বসিয়ে দিলেন। এই রক্তপাতহীন সমাধানে বিস্মিত হলেন সবাই। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভক্তি আরো বাড়ল তাদের।
২৫ বছর বয়সে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিয়ে করলেন তাঁর চেয়ে অন্তত ১৫ বছরের বড় ধনী মহিলা হজরত খাদিজা (রা.)-কে।
মানুষের অসততা ভীষণ কষ্ট দিত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে। তিনি কষ্ট পেতেন যখন দেখতেন বিধবা ও শিশুদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে তাদের সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী কিংবা বলশালীরা। বাবার হাতে কন্যাসন্তানের জ্যান্ত কবর দেওয়া ভীষণ ব্যথিত করত তাঁকে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারসহ মানুষের নানা অনাচার দেখে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। সবসময় ভাবতেন, কীভাবে এর প্রতিকার করা যায়।
ছোটবেলা থেকেই নির্জনতা পছন্দ করতেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। লোকালয় থেকে দূরে গিয়ে ধ্যান করতে তাঁর ভালো লাগত। সংসারের দায়দায়িত্ব সেরে ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই তাই মক্কার অদূরে নির্জন মরুভূমির কোল ঘেঁষে থাকা হেরা পর্বতের এক গুহায় গিয়ে বসতেন।
একদিন হজরত মুহাম্মদ (সা.) হেরার গুহায় গভীর ধ্যানে মগ্ন। তখন তাঁর বয়স ৪০। হঠাৎ গমগমে কণ্ঠে ডাক শোনা গেল, ‘পড়ুন, হে মুহাম্মদ (সা.)।’
চমকে গেলেন তিনি। শিউরে উঠল দেহ। এ কার কণ্ঠ? কে কথা বলে নির্জন পর্বতগুহায়? চোখ মেলে দেখতে পেলেন, আজব জ্যোতিতে আলোকিত হয়ে উঠেছে গুহার ভেতরটা। সামনে দাঁড়ানো এক আজব মূর্তি—তিনি আল্লাহর বাণীবাহক ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.)।
ফেরেশতার কণ্ঠে আবার শোনা গেল, ‘পড়ুন, হে মুহাম্মদ (সা.)।’
ভয়ে ভয়ে জবাব দিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.), ‘আমি তো পড়তে জানি না।’
হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘পড়ুন।’
হজরত মুহাম্মদ (সা.) একই জবাব দিলেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’
হজরত জিবরাইল (আ.) পরপর তিনবার একই কথা বললেন, ‘আপনি পড়ুন।’ তারপর কোরআনের একটি আয়াত পড়ে শোনালেন।
হজরত জিবরাইল (আ.) চলে গেলে দুরুদুরু বুকে বাড়ি ফিরে এলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
হজরত খাদিজা (রা.)-কে বললেন, ‘আমাকে ঢেকে দাও। আমার ভীষণ ভয় করছে।’
হজরত খাদিজা (রা.) স্বামীর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে তাঁর পাশে বসে কী হয়েছে জানতে চাইলেন। কিছুটা সামলে নিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) সব কথা খুলে বললেন।
তাঁকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করলেন হজরত খাদিজা (রা.)।
কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত মুহাম্মদ (সা.) ঘুমিয়ে পড়লে চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে ছুটে গেলেন হজরত খাদিজা (রা.)। হেরা পর্বতের গুহায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনার কথা জানালেন তাঁকে। ওয়ারাকা ছিলেন তাওরাত-ইঞ্জিল ধর্মগ্রন্থের গবেষক। তিনি নিজে ইঞ্জিলের অনুসারী। হজরত খাদিজা (রা.)-এর কথা শুনে হাসলেন—যেন এক মহাপ্রাপ্তি ও আবিষ্কারের হাসি। বললেন, ‘শোনো খাদিজা, এ তো সুসংবাদ। ভয়ের কিছু নেই। যাঁর হাতে আমার জীবন, সেই আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, তুমি আমায় যা যা বললে তা যদি সত্য হয়ে থাকে তো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যিনি এসেছিলেন, তিনি জিবরাইল (আ.), যিনি আসতেন মুসা নবীর কাছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নবী। তাঁকে বোলো, যেন বিপদে-আপদে অটল থাকেন, ভেঙে না পড়েন।’
খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন হজরত খাদিজা (রা.)।