বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ জয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোন ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে চলছে বিশ্লেষণ। এসব বিশ্লেষণে বিএনপির বিজয়কে ভারতের জন্য আপাতত স্বস্তির বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিএনপির এ জয়কে ভারতের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী ভারত নিয়ে ঠিক কী ধরনের পলিসি নেবেনÑ তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার ভারতনীতিকে দেশটির জন্য রীতিমতো উদ্বেগজনক ছিল বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারেক রহমান তার মায়ের নীতি থেকে সরে আসবেন কি নাÑসেটাই ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের আগামী সরকারের সঙ্গে কাজ করা ছাড়া ভারতের সামনে আর কোনো ভালো বিকল্প নেই। মোদি সরকারও তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ব্যাপারে ইতিবাচকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিএনপির বিজয়ের ব্যাপারে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জয়ের পর কালবিলম্ব না করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুদেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির জয়ে সেই সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অভিযোগ করে আসছে ভারত। সরকার গঠনের পর সংখ্যালঘু ইস্যুতে তারেক রহমানের কাছে ভারত তার উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামায়াতের বিপরীতে তারেক রহমানকে অনেক বেশি উদারপন্থি হিসেবে বিবেচনা করে ভারত। ইসলামপন্থি জামায়াত ক্ষমতায় এলে তা হতো ভারতের জন্য উদ্বেগের।
তারেক রহমানের জয় পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এ দুই রাজ্যেই অনুপ্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। ইন্ডিয়া টুডে বলছে, তারেক রহমান জামায়াতের সমালোচক। জামায়াত অনেকটাই পাকিস্তান ও চীনঘেঁষা। সে তুলনায় তারেক রহমান অনেক বেশি উদারপন্থি, যা ভারতের জন্য সুবিধাজনক। ইন্ডিয়া টুডের অন্য এক প্রতিবেদনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ায় একপ্রকার উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যমান সংবিধানে বেশ পরিবর্তন আসবে।
‘তারেক রহমানের জয় ভারতের জন্য কী বার্তা বহন করে’ শিরোনামে এনডিটিভি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচারে তার একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। ভারত এখন অপেক্ষায় আছেÑতারেক রহমানের সে পরিকল্পনা কী, সেটি দেখার জন্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন ও পাকিস্তানের আগেই বাংলাদেশের নতুন নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। চীন-পাকিস্তানের প্রভাবের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৮ মাস ধরে বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তান তাদের প্রভাব যেভাবে বাড়িয়েছে, তাতে করে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে এক অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে তারেক রহমান ঠিক কী ধরনের নীতি গ্রহণ করেনÑতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান-চীন ও বাংলাদেশে সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবকে দুর্বল করে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, ভারতের স্বার্থরক্ষায় শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নতুন সরকার, তথা তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতকে কাজ করে যেতেই হবে। তারেক রহমান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেনÑবাংলাদেশ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি ভারতের স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এ বক্তব্য ধারণা দিচ্ছে, তিনি তার মায়ের নীতি থেকে সরে আসবেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে কথিত হিন্দু নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর যে নির্যাতন চলে আসছেÑতা বন্ধের জন্য তারেক রহমানের কাছে ভারতের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বিএনপির বিজয়কে অত্যন্ত ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে নিশ্চিতভাবেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে যে বার্তা দিয়েছেন, বাংলাদেশের আগামী সরকারও ঠিক একই ধরনের বার্তা দেবে বলে দিল্লির প্রত্যাশা।
নিউজ১৮-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। দুদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বর্তমানে যে স্থবিরতা চলছে তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের সামলোচনা করে বলা হয়, খালেদা জিয়ার ভারতনীতি দিল্লির জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দিক থেকে উদ্বেগের ছিল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ভারতবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মৌলবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। এসব ইস্যুতে তারেক রহমানের বর্তমান পলিসি কী হবেÑতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্স্ট পোস্ট নামে ভারতীয় অন্য একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোÑতারেক রহমান কী তার মায়ের নীতি এগিয়ে নেবেন, নাকি সেখান থেকে সরে নতুন পথে অগ্রসর হবেন। কারণ তার মায়ের শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক উত্তেজনাপূর্ণ সময় পার করে। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক দিল্লির জন্য উদ্বেগজনক। এখন দেখার বিষয় তারেক রহমানের ভারতনীতিতে পাকিস্তান বা চীনের কোনো মতামত প্রতিফলিত হচ্ছে কি না।