আল জাজিরার প্রতিবেদন
‘নৌকা ধানের শীষ লাঙ্গল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ’। দ্রুততালের ছন্দোবদ্ধ গানটির এই কথাগুলোতে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের চিত্র ফুটে ওঠে। তবে বাস্তবে এটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রচারণার একটি গান, যা নভেম্বরের শুরুতে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে (এক্স) ভাইরাল হয়।
এই গানে বাংলাদেশে বিগত সময়ে শাসনক্ষমতায় থাকা দলগুলোর প্রতীকগুলোর কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশিরা এখন প্রত্যাখ্যান করতে চায় বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে এতে। নৌকা হলো ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতীক, ধানের শীষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতীক এবং লাঙ্গল জাতীয় পার্টির নির্বাচনি প্রতীক। জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে চলেছে। ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে মাঠের প্রচারণা শুরু হয়েছে। কিন্তু অনলাইনে দলগুলো মাসখানেক আগে থেকেই লড়াই করে আসছে; জেনজি ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে, যারা হাসিনাকে উৎখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
জামায়াতপন্থি গানটির অনলাইন জনপ্রিয়তা, নির্বাচনি মৌসুমে গান প্রকাশের জন্য দলগুলোর মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতার সূত্রপাত করে। কারণ গণসমাবেশ এখন আর লাখ লাখ ভোটারের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় নয়, সামাজিক মাধ্যমও অনেক শক্তিশালী হাতিয়ার।
লন্ডন-ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা এইচ এ এল বান্না, যিনি জামায়াতের সমর্থনে তৈরি গানটির গীতিকার ও গায়ক, তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এটি প্রথমে ঢাকার একজন প্রার্থীর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। লোকজন যখন এটি শেয়ার করতে শুরু করে, তখন অন্য প্রার্থীরাও এর ব্যবহার শুরু করেন।
বিএনপিও তাদের নির্বাচনি প্রচারণার জন্য গান প্রকাশ করেছে, যার কথাগুলো বলা হয়, জনমত জরিপে জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে, বিএনপি সবার আগে দেশকে এগিয়ে রাখে। গানটির কথাগুলো এমন, ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ। ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।’
২০২৪ সালে হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভের অগ্রভাগে থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও তাদের গান প্রকাশ করে, যা ভাইরাল হয়েছিল।
কিন্তু সংগীত বৃহত্তর ডিজিটাল প্রচারণার একটি অংশ মাত্র। খণ্ড নাটক, আবেগঘন ভোটার সাক্ষাৎকার এবং ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বছর অনলাইনে নির্বাচনি লড়াই সংসদীয় প্রতিযোগিতার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা জুলাই সনদের ওপর গণভোটেও অংশ নেবেন।
অনলাইন কেন গুরুত্বপূর্ণ:
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিলেন, যা দেশটির আনুমানিক ১৭ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ।
২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম ডেটা রিপোর্টালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় ৫ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী, ৯.১৫ লাখ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যাদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি। বিপরীতে এক্সের ব্যবহারকারী তুলনামূলক কম, যাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১.৭৯ লাখ।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর এই সংখ্যার কারণেই রাজনৈতিক দলগুলো অনলাইনে প্রচারণায় ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩.৫৬ শতাংশ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে, যাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো ভোটার অথবা তরুণ বাংলাদেশি, যারা হাসিনার অধীনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন অনিয়ম, বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ও বয়কটের কারণে তা কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। বিশ্লেকেরা বলছেন, ভোট দিতে না পারার সেই অভিজ্ঞতাই আসন্ন ভোটে অংশগ্রহণের দৃঢ় সংকল্পে পরিণত করেছে।
অনলাইন লড়াইয়ে কি কেউ বিজয়ী হচ্ছে:
স্পষ্ট বিজয়ী ঘোষণা করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের একজন ফেলো মুবাশ্বার হাসান বলেন, বিএনপির অনলাইন কন্টেন্ট বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার মূল প্রতিশ্রুতিগুলোকে ছোট, ক্যাপশনযুক্ত ভিডিও এবং শেয়ার করা যায় এমন কার্ডের প্যাকেজ। উদাহরণস্বরূপ, কিছু পোস্ট প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের প্রচার করে, যার অধীনে বিএনপি নির্বাচিত হলে ৫০ লাখ নারী এবং পরিবার প্রতি মাসে ২,০০০-২,৫০০ টাকা অথবা প্রয়োজনীয় পণ্য পাবে।
তিনি বলেন, বিপরীত দিক দিয়ে জামায়াতপন্থি অনলাইন কন্টেন্টগুলোতে বেশির ভাগ সময়ই বিএনপি যে আওয়ামী লীগের চেয়ে আলাদা কিছু নয়, এমন বক্তব্য থাকে।
ফ্যাক্ট-চেক আউটলেট দ্য ডিসেন্টের সম্পাদক কদরউদ্দিন শিশির বলেন, জামায়াত সমর্থিত অনলাইন প্রচারণাগুলো ভারতবিরোধী বক্তব্যগুলোও কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
গণভোটও ভাইরাল হচ্ছে:
এ বছর অনলাইন লড়াই কেবল একটি দলের সঙ্গে আরেকটি দলের প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গণভোটের ওপরও কেন্দ্রীভূত।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে একটি ডিজিটাল প্রচারণা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধানের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সংস্কারগুলো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য জনসাধারণের অনুমোদন নিশ্চিত করতে অনলাইন প্রচারণা প্রয়োজন।
জুলাই বিপ্লিব থেকে উঠে আসা এনসিপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে রায়ের জন্য অনলাইনে প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষক ও কন্টেন্ট নির্মাতারা বলছেন, অফলাইনে প্রচারণা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনি মৌসুমে অনলাইনে ভাইরাল প্রচারণামূলক গানের ধারা শুরু করা জামাতপন্থি গানের সুরকার এইচ এ এল বান্না বলেন, ‘অনলাইন প্রচারণা অফলাইনে লোকজনের মধ্যে আলোচনার বিষয় তৈরি করে।’
আরএ