ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। চলতি মাসের ১২ দিনে সারা দেশে ৩২৬টি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে নির্বাচনের দিন, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২৮১টি ঘটনা ঘটে। ভোটের মাঠে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক পেশিশক্তির ব্যবহার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ছাড় না দেওয়া, পোস্টার ছেঁড়া ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, চলতি ফেব্রুয়ারিতে বরিশালে ৬৪টি ও রাজশাহীতে ৩৭টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তুলনামূলক কম বিশৃঙ্খলা হয়েছে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত জানুয়ারিতে ৭০টি পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আটজন নিহত হন।
সূত্রের তথ্যমতে, নির্বাচনি সুরক্ষা অ্যাপের উপাত্ত অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিভাগে সহিংসতা ও অনিয়মের একাধিক ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিভাগে মোট ১৪টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১২টি ছিল ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা। চট্টগ্রাম বিভাগে ঘটেছে ১৫টি ঘটনা।
ময়মনসিংহ বিভাগে ২১টি ঘটনার মধ্যে একটি ক্ষেত্রে পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খুলনা বিভাগে ৩০টি ঘটনার তথ্য মিলেছে, যার মধ্যে দুটি ঘটনায় পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ৬৪টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে; এর মধ্যে চারটি ঘটনায় পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে আটটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রংপুর বিভাগে ৩১টি ঘটনার মধ্যে ২৫টিই ছিল ভোটকেন্দ্রে সমর্থকদের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা। সিলেট বিভাগে ২৫টি ঘটনার মধ্যে ১৭টি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা আশপাশে বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।
এছাড়াও ময়মনসিংহ-১১ আসনের ভালুকা উপজেলার রাজই ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টের ছেলেকে অপহরণ করে তাকে কেন্দ্র ছাড়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সরাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও বিএনপি জোট প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিবের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ভোটকেন্দ্রের সামনে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
এতে সাময়িক ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কয়েক স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুর-৩ আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে শতাধিক আহত ও শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন।
এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমরের সমর্থক নজরুল ইসলাম নিহত হন। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন-বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন।
পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে মারা যান। এর আগে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনি গণসংযোগে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সরওয়ার হোসেন ওরফে বাবলা (৪৩) নামের একজন নিহত হন। এ সময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, সরোয়ার ও শান্ত নামের তিনজন গুলিতে আহত হন।
ঘটনাস্থলেই সরোয়ারের মৃত্যু হয়। এছাড়া ময়মনসিংহ-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্বের জেরে দুপক্ষের সংঘর্ষে তানজিন আহমেদ (৩০) নামের এক ছাত্রদল কর্মী মারা যান।
পুলিশ জানায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে কুমিল্লা জেলায়। গত ১৯ জানুয়ারি জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সমেশপুর ও তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
গত ২০ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উজিরপুরে ইউনিয়ন বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান। গত ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকার পুরোনো বাসস্ট্যান্ড ওভারব্রিজের নিচে বিএনপির দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
গত ১৬ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের ওই ইউনিয়নেই জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের সদর থানার রিফিউজি মার্কেট এলাকায় জামায়াত ও ছাত্রশিবির কর্মীদের লিফলেট বিতরণকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এতে উভয় পক্ষের দুজন আহত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভোলা-৪ আসনের মনপুরায় নির্বাচনি প্রচারকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন। উপজেলার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের মাস্টারহাটের আলম কলোনি-সংলগ্ন এলাকায় এ সংঘর্ষ ঘটে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সদর উপজেলায় নির্বাচনি প্রচার নিয়ে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে আইজিপি বাহারুল আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, পুলিশ সহিংসতামুক্ত একটি নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের ফলাফলের পর যাতে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ না ঘটতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখছে পুলিশ। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করেন গোয়েন্দা সদস্যরা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় মারধর
বরিশাল অফিস জানায়, বরিশাল-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে জাকির মৃধা নামে এক বিএনপিকর্মীকে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় জাকিরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের চাউকাঠি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জাকির মৃধা ধানের শীষের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপনের পক্ষে কাজ না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহানের পক্ষে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ তোলেন রত্নপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন ও তার সমর্থকরা।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাকির বাড়ি থেকে বের হয়ে চাউকাঠি বাজারে গেলে রত্নপুর ইউনিয়ন আলমগীরের নেতৃত্বে ছাত্রদল কর্মী নোমান, নাদিম ও সুজনসহ তাদের দলবল তাকে মারধর করে। এ সময় তার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে জাকিরকে উদ্ধার করে গুরুতর আহত অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আলমগীর হোসেন আমার দেশকে বলেন, ফুটবলের পক্ষে কাজ করা নিয়ে স্থানীয় ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে জাকির মৃধার বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মাসুদ খান আমার দেশকে বলেন, নির্বাচনের পর কোনো সহিংসতা মেনে নেওয়া হবে না। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শিবগঞ্জে ভোট কম পাওয়ায় বাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ভোটপরবর্তী ফলাফলের সময় কেন্দ্রে ভোট কম পাওয়াকে কেন্দ্র করে হামলা ও পাল্টা হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় দুটি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ভোটের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ও শুক্রবার সকালে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, দুলর্ভপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জগন্নাথপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পিয়ালীমারী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বরাবরই ভালো ভোট পায় বিএনপি। এবারের নির্বাচনে জগন্নাথপুর কেন্দ্রে বিএনপি এক হাজার ৪০০ এবং জামায়াত এক হাজার ভোট পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।
এর জেরে বৃহস্পতিবার ফলাফল ঘোষণার পর উল্লাসরত জামায়াত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এর জেরে সংঘর্ষ বেধে যায়। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও শুক্রবার সকালে বাবর আলী ও তার চাচাতো ভাই সাদিকুলের বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলে আবারও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের তিন-চারজন আহত হয়।