ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে চান তিনি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করে যাবেন বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কার্যালয় সংলগ্ন অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান।
উপাচার্য জানান, উপাচার্য পদ থেকে বিভাগে ফিরে যেতে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বরাবর তিনি চিঠি লিখবেন। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্য কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকবেন।
নির্বাচিত সরকার চাইলে আরও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "সে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করব।”
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, “আমি আমার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে চাই। তবে এই মুহূর্তে হঠাৎ কোনো শূন্যতা বা প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হোক- এটা আমি চাই না। নির্বাচিত সরকার চাইলে ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে আরও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করব।”
নিজের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি দায়িত্ব নেন একটি বিশেষ ও আপৎকালীন পরিস্থিতিতে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল এবং প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সে সময় তার প্রথম লক্ষ্য ছিল একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
দেড় বছর পর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। আমরা আপৎকালীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করতে পেরেছি।”
উপাচার্য আরও বলেন, তিনি কখনোই এই দায়িত্বকে নিয়মিত চাকরি হিসেবে দেখেননি। “এই দায়িত্ব আমার কাছে ছিল একটি আমানতের মতো। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ ও ভালোবাসায় আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম।”
সরে দাঁড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক নিয়াজ বলেন, একটি নিয়মিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে তারা যেন নিজেদের মতো করে প্রশাসন সাজাতে পারে- এটাই তিনি চান। “রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিক, আমরা তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করব,” বলেন তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, আকস্মিকভাবে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে কোনো প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি করা তার উদ্দেশ্য নয়। এ কারণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল চাইলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।
দায়িত্বকালীন অর্জনের কথা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হল সংসদগুলো কার্যকর হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য—টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে প্রায় ২০০ ধাপ উন্নতি হয়েছে, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৬০ শতাংশ এবং গবেষণা ও প্রকাশনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে, যা আবাসন, একাডেমিক ভবন ও গবেষণা অবকাঠামোর ঘাটতি অনেকটাই কমাবে।
উপাচার্য আরও বলেন, সরকারকে তিনি তার ডেপুটেশন প্রত্যাহার করে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে মূল শিক্ষকতার দায়িত্বে ফেরার অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানাবেন।
“অনেকদিন কঠিন পরিশ্রম করেছি। এখন আমার কিছু বিশ্রাম প্রয়োজন,” বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১০ আগস্ট তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল পদত্যাগ করেন। এরপর একই বছরের ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর আর্টিকেল ১১(২) অনুযায়ী অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানকে সাময়িকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।