প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে নির্দিষ্ট কোনো দলের পক্ষে অবস্থান নেবে না যুক্তরাষ্ট্র। জনগণের ভোটে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করবে ওয়াশিংটন। ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে থাকা সবার সঙ্গেই যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি আমার অগ্রাধিকার থাকবে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়াতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে মার্কিন সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট।
গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর ইএমকে সেন্টারে নির্বাচিত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এসব মন্তব্য করেন ঢাকায় নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের পর বাংলাদেশে তার আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, বাংলাদেশে আমার দীর্ঘ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন দূতাবাসে ডেস্ক অফিসার হিসেবে কাজ করেছি। বিএনপি সরকার, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে আর এখন এই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে যে সরকারই নির্বাচিত হোক না কেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেবে না। এটি বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম অধিকার, তারা নির্বাচনে গিয়ে ভোট দেবে নতুন সরকার গঠনের জন্য। এটি কেবল বাংলাদেশের জনগণই ঠিক করবে। অন্য কোনো দেশের এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে আমরা এখানে ব্যাপক পরিবর্তন দেখেছি এবং আমি মনে করি আগামী দিনে আমরা আরো পরিবর্তন দেখতে থাকব।’
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কে উন্নতির অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি, যেমন - অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং নিরাপত্তায়। আমি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আমিও আপনাদের মতোই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, কে নির্বাচনে জিতবে এবং আমরা একসঙ্গে কী করতে পারি—তা দেখার জন্য।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক আরো গভীর করার চেষ্টা করছি। আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ ডলার পেশাদার সামরিক শিক্ষার জন্য দিয়ে থাকি। সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় সহায়ক হিসেবে কাজ করছি। শান্তিরক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রয়োজনে এখানে কী করা যায় এবং সামরিক ক্রয়কে সহজতর করার জন্য কাজ করছি। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কী হতে পারে তা নিয়েও কাজ করছি।
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার চাহিদা পূরণে আমাদের কাছে নানা বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেমন আছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে আমরা আমাদের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর উপযোগী কোনো ব্যবস্থা চিহ্নিত করতে সহায়তা করি—যা বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে আরো মানানসই বা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যদি উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা না থাকে, সেক্ষেত্রেও আমরা আমাদের মিত্রদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে সেই চাহিদা পূরণে সহায়তা করি।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে মার্কিন সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ও পরবর্তী সরকারের কাছে ব্যাখ্যা করা হবে।
সেখানে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বড় দেশগুলোর বিবাদ এড়িয়ে ঢাকা কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, আমার শুনানিতে প্রতিশ্রুতি করেছি, বাংলাদেশে সরকারের মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে—তা সে অন্তর্বর্তী সরকার হোক বা নবনির্বাচিত সরকার হোক, আমি যোগাযোগ রাখব। যাতে চীনাদের সঙ্গে জড়িত থাকার ঝুঁকি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়। বাংলাদেশ সরকার কি সে পথে যেতে চায়? যেমনটি আমি আমার শুনানিতে বলেছিলাম, আমাদের অংশীদার সামরিক বাহিনীকে তাদের সক্ষমতার চাহিদা পূরণে সহায়তার জন্য আমাদের কাছে অনেক বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন সরঞ্জামও অন্তর্ভুক্ত।
মিয়ানমার পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আট বছর ধরে বেশিরভাগ সহায়তা দিয়ে এসেছে। আমরা আর তা ধরে রাখতে পারছি না। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এ বৃহত্তর বোঝায় অংশগ্রহণে আহ্বান জানিয়েছি। আমরা অন্য অংশীদারদের দিকে তাকিয়ে আছি, যারা এগিয়ে এসে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে, যেমনটি আমরা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছি।
মার্কিন অনুদান বন্ধ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী সমস্ত সহায়তা কর্মসূচির একটি বিস্তৃত পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। যাতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ কার্যকরভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। এ পর্যালোচনার ফলে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে—ইউএসএআইপি ভেঙে দেওয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের তহবিল। পাশাপাশি বাংলাদেশে আমাদের অনেক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে শক্তিশালী স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা করি এবং তা চালিয়ে যাচ্ছি। শিগগির মার্কিন আরো কিছু কার্যক্রম দেখতে পাবেন।
পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা হলো, তারা বাংলাদেশের জনগণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। আমরা যা চাই তা হলো, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করা, সরকারে আমরা যে কাজ করেছি তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের সম্পর্ক জোরদার করা, বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিষয়, অর্থনৈতিক বিষয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাজ করা, সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। আমরা দুদেশই নিজস্ব জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করছি। নতুন নির্বাচিত সরকার হিসেবে যেই নির্বাচিত হোক না কেন, আমরা আশা করি ব্যবসার জন্য একটি উন্নত পরিবেশ তৈরি করব। যেখানে আরো মার্কিন প্রতিষ্ঠান আসতে এবং ব্যবসা করতে চাইবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও সাহায্য করবে, বাংলাদেশে আরো সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে।
মার্কিন নতুন ভিসানীতি নিয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি। বিশ্বের অনেক দেশও এর মধ্যে রয়েছে। ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত থাকা, অবৈধভাবে থাকা, অবৈধ প্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করে মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
অভিবাসন ভিসা স্থগিত নিয়ে তিনি বলেন, মার্কিন আইনের একটি অংশ হলো অভিবাসন এবং যাদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তারা মার্কিন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেসব দেশের অভিবাসন ভিসা সাময়িক স্থগিত, যেসব দেশের অভিবাসী প্রবেশ এবং সরকারি সহায়তায় যাওয়ার হার খুব বেশি। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।