হোম > জাতীয়

মুম্বাইয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে হাদির খুনি ফয়সাল

ওয়াসিম সিদ্দিকী

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আইকন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও মূল ঘাতক ও পরিকল্পনাকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কার্যকর সহযোগিতা করছে না—যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ হত্যাকাণ্ডের পর সীমান্ত পার হয়ে প্রথমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন। পরে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে তাদের ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের একটি সুরক্ষিত এলাকায় স্থানান্তর করা হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, মুম্বাইয়ের মতো বিশাল শহরে আত্মগোপন তুলনামূলক সহজ। রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থের জোগান ও পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ থাকায় এ শহর অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ প্রেক্ষাপটে ‘ফয়সাল দুবাইয়ে পালিয়েছে’—এমন তথ্যকে বিভ্রান্তিকর গুজব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুম্বাইয়ে স্থানান্তর

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত ২৮ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা হাদি হত্যার অভিযুক্তদের পালিয়ে যাওয়া ও আত্মগোপনে লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব, হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী, ছাত্রলীগ নেতা রাকিবুল ইসলাম ও রুবেল এবং সীমান্ত এলাকার মানবপাচারকারী ফিলিপস।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ফয়সাল ও আলমগীরের অবস্থান এবং হত্যার নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের পরিচয় স্পষ্ট হতো।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও ভারতের ‘না’

আটকের খবর পাওয়ার পর কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আটক ব্যক্তিদের হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। তবে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি আটকের বিষয়ে পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট তথ্যও শেয়ার করা হয়নি।

বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমআইএলএটি) কাঠামো বিদ্যমান। নিরাপত্তা সূত্র মতে, এই চুক্তির আওতায় যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ, ডিজিটাল প্রমাণ আদান-প্রদান কিংবা অন্তত প্রাথমিক তথ্য শেয়ার করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেÑ খুনিরা তাদের ভূখণ্ডে নেই। অথচ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের হাতে আটক সহযোগীদের বিষয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর রকমের এড়িয়ে যাওয়া কিংবা অস্বীকার করার প্রবণতা। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ওই পাঁচজনই ছিল মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তাদের না পাওয়া মানে তদন্তের একটি বড় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও পালানোর রুট

গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, হাদি হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত কিলিং মিশন। কয়েক দফা সাক্ষাৎ, রেকি, চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী হামলা চালানো হয়। হাদি কিলিং মিশনের সূচনা ঘটে গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৮টা ১৮ মিনিটে, যখন ফয়সাল ও তার সহযোগী কবির বাংলামোটরের ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে যান। সেখানে প্রায় ছয় মিনিট অবস্থান করে তারা শরীফ ওসমান হাদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা চালায় এবং একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। এই যোগাযোগই ছিল পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। ৯ ডিসেম্বর রাতে ফয়সাল আবার ওই কেন্দ্রে হাজির হয়; এবার তার সঙ্গে ছিলেন নতুন সহযোগী আলমগীর। নির্বাচনি প্রচারের সুযোগে ফয়সাল নিজেকে হাদির প্রচারণা টিমে যুক্ত করতে সক্ষম হয়। পরদিন সেগুনবাগিচায় প্রচার কার্যক্রমে তারা সরাসরি অংশ নেয়।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনীয় প্রচারে সম্পৃক্ত হওয়ার পরই হত্যার নকশা চূড়ান্ত করা হয়। নরসিংদী, সাভার ও মানিকগঞ্জসহ একাধিক এলাকায় সম্ভাব্য চলাচল ও অবস্থান নিয়ে রেকি করা হয়। সে অনুযায়ী ১২ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় হাদি মতিঝিলের দিকে রওনা হলে তারা পিছু নেয়। জুমার নামাজ শেষে দুপুর সোয়া ২টায় হাদি বের হলে অনুসরণ অব্যাহত থাকে এবং পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে ঢোকার পর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই পালানোর রুটও ছিল আগেই নির্ধারিত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল ও আলমগীর ওই রাতেই ঢাকা ছাড়ে এবং একাধিক যানবাহন বদলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে পৌঁছে। সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখেন যুবলীগ নেতা তাইজুলÑ এমন তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী দল। পুলিশ তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আটক করে। তদন্তকারীদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়া-হত্যার প্রস্তুতি থেকে সীমান্ত পেরোনোÑএকটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়, যা মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আলোচনায় ভারতের অসহযোগিতা

হাদি হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও এক্সে #JusticeForHadi ‘জাস্টিজ ফর হাদি’ হ্যাশট্যাগটি এখনো ট্রেন্ডিং। নেটিজেনদের ক্ষোভের মূল লক্ষ্য এখন ভারতের অসহযোগিতা। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ‘ভারত কি বাংলাদেশের খুনিদের ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে?’ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দাবি করা হচ্ছে, ফয়সাল দাউদ কেবল একজন সন্ত্রাসীই নয়, সে একটি বিশাল রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ। তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত দেশের ছাত্র-জনতা শান্ত হবে না। ঘাতকরা যদি সিসিটিভিতে ধরা পড়ার পরও সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ থাকে, তবে তা আইনের শাসনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক। বর্তমানে তদন্তকারীরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

অপরাধ বিশ্লেষক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, এই হত্যাকাণ্ড একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক চক্রের ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের অপরাধ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দ্রুত আঘাত, তারপর নির্বিঘ্নে সীমান্ত পারাপার—এই প্যাটার্ন ভবিষ্যতে আরো সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। চিহ্নিত খুনিরা যদি বিদেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে তা অন্য অপরাধীদেরও একই পথ অনুসরণে উৎসাহিত করবে।

তিনি বলেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করেও খুব একটা লাভ হবে না। এসব ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের ভূমিকা খুব একটা কার্যকর নয়। হাদির খুনিদের ফিরিয়ে আনতে প্রতিবেশী দেশের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কঠিন।

বন্ধ ও লোকসানি কারখানা সচলে বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

রোববার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী

বিচার বিভাগের বাজেট বাড়ানোর দাবি, সমর্থনে আইনমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি

শাহজালালের (রহ.) মাজারে দানব্যবস্থায় স্বচ্ছতার উদ্যোগ, প্রশংসায় ভাসছে প্রশাসন

শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার দাবি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির

ইবতেদায়ী শিক্ষকদের কষ্টের কথা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তুলে ধরলেন এমপি এজাজ

ফের বৃষ্টি কমে বাড়বে ভ্যাপসা গরম

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নতুন চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম

প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে ৬৫ হাজারের বেশি স্কুল অংশগ্রহণ করেছে

পাবনা-ঢাকা রুটে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হচ্ছে আগস্টে