হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

নজিরবিহীন টানা শীতে কাঁপছে দেশ, জনদুর্ভোগ

সরদার আনিছ

ছবি: আমার দেশ

শীতের তীব্রতা বাড়ায় কাঁপছে রাজধানীসহ সারা দেশ। এতে জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছে; বিপাকে পড়ছেন কর্মজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষ। আবহাওয়া দপ্তর বলছে, দিনের বেশির ভাগ সময় কুয়াশায় আকাশ ঢাকা; সূর্যের আলো দেখা না দেওয়ায় শীতের অনুভূতি বেড়েছে। দুই দিন এ অবস্থা বজায় থাকার পর ৫ জানুয়ারি থেকে তাপমাত্রা কমে সারা দেশে শীতের তীব্রতা এবং ঘন কুয়াশা আরো বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে মৃদু থেকে মাঝারি আকারের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে।

গতকাল শুক্রবার ঘন কুয়াশার কারণে নামতে না পারায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৯টি ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয়েছে। পরে আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে স্বাভাবিক বিমান চলাচল শুরু হয়।

গতকাল রাতে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, আগামী দুই দিন তাপমাত্রা সামান্য বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও শীতের অনুভূতি একই রকম থাকতে পারে। এরপর আগামী ৫ জানুয়ারি থেকে তাপমাত্রা আরো কমে মাঝারি আকারের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা ও পরিধি বাড়ার পাশাপাশি তীব্র শীত অনুভূত হতে পারে। মাসজুড়েই শীত থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, গত দুই দিনে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আগের কয়েক দিনের মতো এমন আবহাওয়া কখনো দেখা যায়নি। সাধারণত শীতের মৌসুমে একাধারে দুই-তিন দিন ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে, পরে তা কেটে যায়; মানুষ তেমন টের পায় না। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন; উত্তরাঞ্চলে ১০-১২ দিন এবং ঢাকায় ছয়-সাত দিন ধরে একই ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা বিরাজ করায় শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঘন কুয়াশা পড়ায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্যও কমে গিয়ে ঠান্ডা হয়; শীতের অনুভূতি অনেক বেড়ে যায়।

আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, আগের দিনের তুলনায় শৈত্যপ্রবাহের পরিধি কমে গতকাল শুক্রবার দেশের সাত জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছিল। এদিন দ্বিতীয় দিনের মতো যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। আগের দিন বৃহস্পতিবারও এখানে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে শুক্রবার রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা আগের দিন ছিল ১৩ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এছাড়া গত কয়েক দিনের তুলনায় দু-তিন দিন ধরে কুয়াশার চাদর পেরিয়ে সূর্যের আলো দেখা দিলেও তা ছিল ক্ষণিকের জন্য। দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের কিরণ স্থায়ী না হওয়ায় রাজধানীসহ সারা দেশেই শীতের অনুভূতি বাড়ছে।

এভাবে টানা শীতের দাপটে শহর-গ্রামে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মানুষ দুর্বিষহ অবস্থায় জীবন যাপন করছে। বিশেষ করে ভোরে কাজে বের হওয়া রিকশাচালক, দিনমজুর ও পথচারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

মধ্যরাত থেকেই ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে রাজধানী। সেই সঙ্গে তাপমাত্রাও নেমেছে ১৩ ডিগ্রির ঘরে। ফলে শীতের তীব্রতা আরো বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোর থেকেই কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। ছুটির দিন হওয়ায় বাইরে লোকজনের চলাচল কম লক্ষ করা গেছে। তবে যারা জরুরি কাজে বের হয়েছেন, তীব্র শীতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে কুয়াশার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সকালেও সড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। কোথাও কোথাও ধীরগতিতে যান চলাচলের খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে আগের দিনের মতো শুক্রবার সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার পরে কুয়াশার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ছে। দুপুরের দিকে হালকা রোদের তাপ পাওয়া গেলেও তেজ না থাকায় শীতের অনুভূতি আগের মতোই ছিল। ফলে গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীবাসীকে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত পোশাক ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।

শীতের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের জন্য শীত যেন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে শিশু ও বয়স্করা ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফুটপাতের পাশে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এদিকে শীতের পোশাকের কেনাকাটাও বেড়ে গেছে।

ঘন কুয়াশায় ফ্লাইট ডাইভার্ট

ঘন কুয়াশার কারণে নামতে না পারায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৯টি ফ্লাইট গতকাল শুক্রবার অন্যান্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক বার্তায় জানিয়েছে, ডাইভার্ট হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে চারটি চট্টগ্রামে, চারটি ভারতের কলকাতায় এবং একটি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাঠানো হয়। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুনরায় স্বাভাবিক বিমান চলাচল শুরু হয়।

শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা ও কম দৃশ্যমানতার কারণে ঘন ঘন ফ্লাইট ডাইভার্ট হওয়ার পেছনে শাহজালাল বিমানবন্দরে ক্যাটাগরি-২ ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) না থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান ক্যাটাগরি-১ আইএলএসকে ক্যাটাগরি-২-এ উন্নীত করা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। তবে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) এখনো প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে পারেনি।

আইএলএস হলো একটি নির্ভুল রানওয়ে অ্যাপ্রোচ সহায়ক ব্যবস্থা, যা রেডিও সিগন্যাল ও উচ্চক্ষমতার আলোক ব্যবস্থারের মাধ্যমে ঘন কুয়াশার মধ্যেও পাইলটদের অবতরণে দিকনির্দেশনা দেয়। এ উন্নয়ন না হওয়ায় কম দৃশ্যমানতার সময় ফ্লাইটগুলোকে প্রায়ই সিলেট, চট্টগ্রাম, ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাঠাতে হয়। এতে সামগ্রিক ফ্লাইট সূচিতে বিলম্ব, যাত্রীদের ভোগান্তি এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ও বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ ও পার্কিং ফিসহ বিভিন্ন খরচের কারণে এয়ারলাইনসের আর্থিক ক্ষতি হয়।

আমাদের রংপুর প্রতিনিধি বাদশাহ ওসমানী জানান, হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর সূর্যহীন আকাশে উত্তরাঞ্চলে কনকনে শীত চরম আকার ধারণ করেছে। সারা দিন সূর্যের দেখা না মেলায় কমছে না ঠান্ডার তীব্রতা। ফলে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষ, থমকে গেছে তাদের রোজগার। পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে অনেকের। শীতের প্রকোপে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগ।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, শিশু ও নারীর সংখ্যাই বেশি।

পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শীতে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ কেউ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। অর্থের অভাবে গরম কাপড় ও চিকিৎসাÑকোনোটিই জুটছে না। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীত নিবারণে খেটে খাওয়া গরিব মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। গরিব-মধ্যবিত্ত পরিবারের বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা মিলছে না। সরকারিভাবে খেটে খাওয়া গরিব ও অসহায় মানুষের শীত নিবারণে পদক্ষেপ না নিলে নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যরা আরো বেশি বিপাকে পড়বেন বলে তারা জানান।

আমাদের রাজৈর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি টুটুল বিশ্বাস জানান, রাজৈরে টানা পাঁচ দিনের শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা আর সূর্য দেখা না যাওয়ায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এলাকা থাকে নিস্তব্ধ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ।

ভোরের দিকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে দিগন্ত। দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ধীরগতির যানবাহনের কারণে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। কোথাও কোথাও স্বাভাবিক চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এই শীতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও অটোরিকশা চালকদের ওপর। কনকনে ঠান্ডায় ভোরে কাজে বের হওয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বের হলেও পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় কাঁপতে কাঁপতে কাজ করতে হচ্ছে। ফলে আয় কমে যাওয়ায় বেড়েছে সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তা।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে সিনপটিক অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এতে আজ শনিবার অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় আট থেকে ১০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। পাশাপাশি দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, পঞ্চগড়, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার উপর দিয়ে মুদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গা থেকে তা প্রশমিত হতে পারে। সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়ার অবস্থায় তাপমাত্রা আরো কমতে পারে।

রাজধানীতে ঘন কুয়াশা কাটবে কখন, জানাল আবহাওয়া অফিস

জানুয়ারিতে আসছে পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহ

কুয়াশার চাদরে মোড়ানো রাজধানী, বিপর্যস্ত জনজীবন

৪ জানুয়ারির পর ফের শীত বাড়বে

১৭ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ কবে থেকে কমবে, জানাল আবহাওয়া অফিস

নতুন বছরের প্রথম দিনে ঢাকার তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রিতে

শীতে কাঁপছে দেশ, যে বার্তা দিল অধিদপ্তর

কবে সূর্যের দেখা মিলবে, জানাল আবহাওয়া অফিস

ঢাকায় শীত নিয়ে যে বার্তা আবহাওয়া অফিসের

শীতের তীব্রতা নিয়ে আবহাওয়া অফিসের বার্তা