হোম > মতামত

কেন বন্ধু না হয়ে প্রভু হতে চায় ভারত

নুরুল্লাহ আলম নুর

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখা প্রতিটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, যখন দুটি দেশ একটি সীমানা ভাগাভাগি করে, তখন সেই সম্পর্কের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের আচরণে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কের পরিবর্তে প্রভুত্বের প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়, যা গভীর উদ্বেগের কারণ।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বারবার নৃশংস হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটাচ্ছে, যা বন্ধুত্বের বদলে প্রভুত্বের ইচ্ছারই প্রতিফলন। এ ধরনের হামলা এবং হত্যার ঘটনা শুধু একটি দেশের নাগরিকদের জীবনহানি ঘটাচ্ছে না, বরং দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ফাটল সৃষ্টি করছে। সীমান্তে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং অত্যাচারের ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। এর ফলে আস্থার যে ভিত্তি দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারত, তা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের অমানবিক আচরণ এবং হত্যাকাণ্ড সেই প্রচেষ্টাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবনহানি ও নির্যাতনের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং তা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশি জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এ ধরনের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ভারতকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বিএসএফের এমন আগ্রাসী আচরণ বন্ধুত্বের নীতির পরিবর্তে প্রভু হওয়ার আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। দেশটির এই আচরণ শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায়-বিচারের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী। ভারতের এই আগ্রাসী আচরণ দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলছে।

২০১১ সালে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পেরোনোর সময় ফেলানী নামের ১৫ বছরের এক কিশোরীকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। লাল ডোরাকাটা সুয়েটার গায়ে দেওয়া ফেলানীর গুলিবিদ্ধ লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলেছিল কয়েক ঘণ্টা। ফেলানীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সীমান্তে ভারতের নৃশংসতার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিএসএফের এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছিল। এমনকি ভারতেও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু তারপরও সীমান্তে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে বিএসএফের হত্যার ঘটনা থামছেই না।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। দিনাজপুরের বালুবাড়ী সীমান্তে বাংলাদেশি এক কৃষক নিজের জমিতে কাজ করার সময় বিএসএফ সদস্যরা বিনা কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সীমান্তের মানুষদের জন্য এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু আতঙ্কের কারণ নয়, বরং তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফ সদস্য একজন বাংলাদেশি কিশোরকে হত্যা করে। ওই কিশোর সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি খেলতে গিয়েছিল। এটাই ছিল তার অপরাধ। বিএসএফ সদস্যরা এই তুচ্ছ কারণেই তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় ভারতের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনোই কাজ হচ্ছে না। বদলাচ্ছে না ভারতের আচরণ। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সম্মেলন হচ্ছে। এসব সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা কমানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল বিএসএফ। তবে বাস্তবে এর কোনোই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আমাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা ঈদের সময় বিএসএফ আমাদের লাশ উপহার দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা থামছেই না, বরং দিন দিন বাড়ছে।

এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু সীমানার নিরাপত্তার প্রশ্নে নয়, মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের ঘটনা বারবার তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু ভারতের নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা দেখে বোঝাই যায়, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কের চেয়ে প্রভুত্বই ফুটে উঠে বেশি। ভারতের এই আচরণ সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বিএসএফের নিষ্ঠুরতা শুধু হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা সীমান্তের বাংলাদেশি অংশে ঢুকে অনেক সময় সাধারণ মানুষের ওপর শারীরিক নির্যাতন করে ও ধরে নিয়ে আটকে রাখে। শুধু পুরুষ নয়, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরাও তাদের নৃশংসতার হাত থেকে রেহাই পায় না। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তে এক কিশোরকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে এবং তার পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন যে সম্পর্ক বন্ধুত্ব, সম্মান এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতা পরিবেশ গড়ে তোলা করা খুবই জরুরি। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে ভারতকে প্রথমেই ভারতকে তার আধিপত্যবাদী মনোভাবকে পরিত্যাগ করতে হবে।

মৌলিক মানবিকতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এমন সম্পর্কই আমরা আশা করি, যেখানে সীমান্তে কোনো নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হবে না এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কোনো আশঙ্কা থাকবে না। পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধুত্বের ভিত্তি গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সব সমস্যার সমস্যার সমাধান হবে এবং সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।

ভারতের সব সরকারেরই উচিত সীমান্তে বাংলাদেশিদের বিনা কারণে হত্যা বন্ধ করাসহ যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাভে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপারে আধিপত্যবাদী মনোভাব চিরতরে পরিহার করে এ দেশের বিশেষ কোনো দল বা সরকার নয়, বরং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। তাহলেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত