ডিজিটাল যুগে সংবাদ পরিবেশনের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বদলে গেছে তার ভাষা ও কৌশল। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ড। একটি ছবি, তার ওপর বড় ফন্টে কয়েকটি শব্দ-ব্যস, খবর প্রস্তুত। কিন্তু এই সহজীকরণের আড়ালে যে বিপজ্জনক প্রবণতা গড়ে উঠছে, তা আজ বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিকে ক্রমেই সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘মিডিয়ার ফটোকার্ড সন্ত্রাস’।
ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোয় স্ক্রল-সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম দ্রুত গ্রহণযোগ্যতার জন্য বেছে নিয়েছে ফটোকার্ড। কারণ, পাঠক পুরো সংবাদ পড়ে না; চোখে পড়লেই ক্লিক, রিঅ্যাক্ট ও শেয়ার। ফলে জটিল বাস্তবতাকে এক লাইনে নামিয়ে আনার প্রবণতা বেড়েছে। সমস্যাটি তখনই শুরু হয়, যখন সেই এক লাইনে সত্যের চেয়ে উত্তেজনা বেশি জায়গা পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফটোকার্ডগুলো প্রায়ই হয় উসকানিমূলক, চাঞ্চল্যকর ও উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। পূর্ণ খবরটি পড়লে দেখা যায়, বাস্তবতা অনেক বেশি সংযত ও বহুমাত্রিক, যা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কখনো কখনো ফটোকার্ডের সঙ্গে ভেতরের খবরের মিল থাকে না। কিন্তু ফটোকার্ড একটি নির্দিষ্ট বয়ানই চাপিয়ে দেয়। এতে পাঠকের মনে তৈরি হয় ক্ষোভ, আতঙ্ক কিংবা ঘৃণা, যা পরে সামাজিক উত্তেজনায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশে রাজনীতি এমনিতেই তীব্র মেরূকরণ। ফটোকার্ড এই মেরূকরণকে আরো ধারালো করে তুলেছে। কোনো বক্তব্যের একাংশ কেটে এনে, প্রসঙ্গহীনভাবে ফটোকার্ডে বসানো হয়। ফল-এক পক্ষ উল্লসিত, অন্য পক্ষ ক্ষুব্ধ। কমেন্ট বক্সে আলোচনা নয়, শুরু হয় গালাগাল, হুমকি। কখনো অনলাইনের বিরোধ বাস্তব জীবনেও সংঘাত ডেকে আনে। সংবাদ এখানে তথ্যের বাহক না হয়ে পরিণত হয় রাজনৈতিক অস্ত্রে। এতে করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্কের তিক্ততা বাড়ছে, যা দেশকে সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।
ফটোকার্ড সন্ত্রাস মূলত সাংবাদিকতার নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। ভিউ, রিচ আর এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় সত্য, যাচাই ও ভারসাম্য গৌণ হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড সংশোধনের আগেই হাজার হাজার শেয়ার হয়ে গেছে। পরে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিলেও ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়ে যায়।
এই ধারাবাহিক বিভ্রান্তি সমাজে অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে। মানুষ আর সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষ মনে করছে না। গুজব আর খবরের পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক ইস্যুতে একটি ভুল ফটোকার্ড মুহূর্তেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে। এভাবেই দেশ ধীরে ধীরে অনিবার্য সংঘাতের পথে এগোচ্ছে।
কিন্তু এভাবে একটি দেশের সংবাদমাধ্যম চলতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণে দায়িত্ব তিন পক্ষের-মিডিয়া, রাষ্ট্র ও পাঠকের। মিডিয়ার দায়িত্ব হলো, ফটোকার্ডে সংযম, নির্ভুল শব্দচয়ন এবং প্রাসঙ্গিকতা নিশ্চিত করা। উত্তেজনা নয়, তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা। আর সচেতন পাঠকের উচিত একটি ফটোকার্ড দেখেই প্রতিক্রিয়া না দিয়ে পুরো খবর পড়া, যাচাই করা। ফটোকার্ড নিজে কোনো অপরাধ নয়; অপরাধ হলো এর দায়িত্বহীন ব্যবহার। সংবাদ যদি আলো জ্বালানোর বদলে আগুন ধরায়, তবে তা সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়; বরং অভিশাপ। রাজনৈতিক অঙ্গন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শান্তি এবং স্থিতিশীলতার স্বার্থে মিডিয়ার এই ফটোকার্ড সন্ত্রাস এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। নইলে আমরা সবাই অজান্তেই এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে হাঁটছি।
লেখক : শিক্ষার্থী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি