হোম > মতামত

এমন প্রতিশ্রুতি কেন

খাজা মাঈন উদ্দিন

এই জিজ্ঞাসা চলমান শতাব্দীর শুরুর দিককার। শিক্ষামূলক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে, মিলেনিয়াল প্রজন্মের এক হাইস্কুলের ছাত্র কৈফিয়ত চাওয়ার সুরে প্রশ্নটি ছুড়ে দেয় উপস্থিত সরকারি পরিকল্পনাবিদদের সামনে।

তাতে জ্ঞানী-গুণী সংসারাভিজ্ঞরা বড়ই হতভম্ব হয়ে পড়েন। পালন করতে না পারার মতো ওয়াদা কেন করা হয়, সে বিষয়ে কৈশরের সরল মনকে বোঝাতে পারার মতো ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষের ভান্ডারে তখন ছিল না, ফ্যাসিবাদ জর্জরিত রাষ্ট্রে আরো নেই।

কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। অর্থ ব্যয় হলেও কাজ হয় অনেক কম। কিছু বড় প্রকল্প নেওয়াই হয় অর্থ ভাগবাটোয়ারার উদ্দেশ্যে। আর শত ফুল ফোটানোর কাগুজে প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পর্যন্ত থাকে না।

সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ‘বস’রা আরেক ডিগ্রি ওপরে। তারা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় বাস্তবায়নের বিষয়ে ততটা মনোযোগী থাকেন না অথবা অবগতও নন। রাজনৈতিক মঞ্চে যা বলা হয়, তা একেবারেই কথার কথা।

সারা দুনিয়ায় নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে সেকেলে রাজনীতির ওই বাগাড়ম্বর হয়ে দাঁড়িয়েছে জনসংযোগহীন প্রলাপ।

ডিজিটাল যুগের সূচনালগ্নের ওই মিলেনিয়াল ছাত্রদের পর এসেছে আরেক কাঠি ‘সরেস’ জেনারেশন জুমার্স বা জেন-জি।

প্রধানত জেন-জি এবং কিছুটা মিলেনিয়াল এই দুই প্রজন্ম দেশের পুরো সিস্টেমের প্রতি সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করে ফেলেছে; যার রিহার্সেল বা মহড়া হয় ২০১৮-এর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো প্রতিবাদে এবং চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব এবং ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার গদি উল্টে যাওয়ার ঘটনায়।

নতুন শতাব্দীতে আরব বসন্ত, ইউরোপ-আমেরিকায় প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি সংক্ষুব্ধ পরস্পরবিরোধী তরুণসমাজের উত্থান, দেশে দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রতিবাদ ও জনমত গঠন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পর নেপালে গণরোষে সরকারপ্রধানের পলায়নের নজির সৃষ্টি হলো। এসবের নায়ক এই তরুণ প্রজন্ম, নির্দিষ্ট করে বললে, মিলেনিয়াল ও জেন-জি।

তারপর? বাংলাদেশি তারুণ্যের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু কী এবং তাদের গন্তব্যই বা কোথায়, তা কতখানি জানি বা জানার কোনো কৌতূহল কি আছে?

তার আগে খেয়াল করা দরকার ৫ আগস্ট ২০২৪-এ কীসের জন্য মারা পড়েছে প্যাঁচ মেরে কথা বলার পুরোনো রাজনীতি। সেদিন ‘হাসিনার বিকল্প নেই’ যুক্তি খাড়া করা হাসিনাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে বিপ্লবের তরুণ শক্তি।

জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করতে দেড় দশকে তৈরি করা হয় নানা কুযুক্তি ও মিথ্যা ও অর্ধসত্য বয়ান। সেগুলো সরলভাবে কিন্তু রক্ত দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে ৪০-এর কমবয়সি অনভিজ্ঞ মানুষ। তাই বলে মধ্যবয়সি ও প্রবীণরা ঘরে বসে থাকেননি।

সুতরাং, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি ঘটনামাত্র নয়; এটি এক যুগের অবসান এবং বয়স যা-ই হোক নতুন প্রজন্মের উত্থানও।

বাংলাদেশে বর্তমান জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬ কোটি ১৮-৪০ বছর বয়সের অন্তর্ভুক্ত, যা মোট ভোটারদের অর্ধেকের বেশি। তারাই হতে পারে ফেব্রুয়ারি-২০২৬-এর ভোটের ফল নির্ধারণের শক্তি।

তাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আচরণের কিছুটা নমুনা দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে। দুটি নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত ছাত্রশিবির জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক ভোটারদের সঙ্গে পেয়েছে, যতটা পায়নি সাবালক দল বিএনপি এবং নাবালক এনসিপির প্যানেলগুলো।

ঐতিহ্যবাহী ডাকসু (ঢাকা ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রভাবক ভূমিকা রেখেছে অতীতে। ১৯৬৯-এর ডাকসুতে নিজস্ব ছাত্র সংগঠন জেতার পর ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং ১৯৯০-এ বিএনপি ছাত্রদলের ডাকসু জয় ১৯৯১-এ মূল দলের জাতীয় নির্বাচনি বিজয়ের পথ রচনা করে।

সেই আলোকে জামায়াত আশাবাদী এবং বিএনপি নৈরাশ্যবাদী হতেই পারে; তরুণ নেতৃত্বের দল হয়েও এনসিপি নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে করতে পারে। কিন্তু এবারের হিসাব অতটা পুরোনো সরলরেখায় টানা যাবে না।

যদি ধরে নিই জামায়াত তার প্রতিযোতিতামূলক সংসদীয় এলাকার সংখ্যা ৪০ থেকে আড়াই গুণ বাড়াতে পারে, তাতেও মাত্র ১০০ আসনে জেতার দৌড়ে থাকবে দলটি। বিএনপির সম্ভাবনার থালাটা অনেক বড়, তবে অধিক অনিশ্চিতও, কারণ বয়স্ক ভোটব্যাংক এবং দলে বিদ্রোহপ্রবণতা। এনসিপি অভিজ্ঞদের দলে ভেড়ালে তরুণ ভোটাররা আরেকটু আস্থা পেতেও পারেন।

বাংলাদেশের নতুন ভোটের মাঠে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তার দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দল কতটা নিঃশেষিত এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, তা বোঝা যাবে তাদের স্বতন্ত্র বা রঙ-বেরঙের প্রার্থীর প্রতি জনসমর্থনের মাত্রা দেখে।

এবার তরুণদের ভোট দেওয়ার আচরণ নির্ভর করবে সম্ভবত দলগুলোর ইশতেহার ও তাদের প্রার্থীদের ব্যক্তিত্ব, ট্র‍্যাক রেকর্ড ও প্রতিশ্রুত কর্মসূচির ওপর। প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় ‘কলাগাছ’ মার্কা প্রার্থী (দুর্বল, ব্যক্তিত্বহীন) দাঁড় করিয়ে দিলেও দলীয় প্রতীকের জোরে পাস করে আসবে, এখন পর্যন্ত তার কোনোই প্রমাণ রাখেনি মিলেনিয়াল ও জেন-জিরা। জুলাই ২৪-এর জন-আকাঙ্ক্ষা বিজয়ী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত বছর হাসিনার পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বিপ্লবের এজেন্ডা ও তরুণদের প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ হয়ে যায়নি এবং তেমনি নির্বাচনের মাধ্যমেও কিংবদন্তির ‘সব পেয়েছিল দেশ’ (এল দোরাদো) হয়ে যাবে না বাংলাদেশ। গণতন্ত্র চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সংগ্রাম সবে শুরু হবে হয়তো।

আগামীতে সরকার গঠন করা দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যান্য দল এবং বাইরের বিরোধী দলÑসব রাজনৈতিক পক্ষকেই নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের মুখে থাকতে হবে। নেটওয়ার্কিংয়ের যুগে যেকোনো ব্যক্তির বা সম্মিলিত কণ্ঠ যেকোনো কর্তৃপক্ষকেই নিরন্তর চাপে রাখতে পারে।

বাংলাদেশে কে কী রাজনৈতিক বক্তব্যের কথামালা সাজিয়েছিলেন ও উন্নয়নের ‘কটকটি’ খাওয়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজনীয় কাজ হবে। সেই রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞ জনগণের নজরদারির বাইরে রাখতে পারার আশা যদি কেউ করে থাকেন, তবে তারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাস করছেন।

বরং ভোটের আগেই অনেকে দেখতে চাইবে আপনার প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য।

রাষ্ট্র যেসব উদ্যোগ নেওয়া ও কাজ করার কথা, সেগুলো কোন পর্যায়ে আছে কিংবা কোন মন্ত্রী বা আমলার জন্য ফাইল আটকে আছে, নতুন প্রজন্ম সে খবর জানতে চাইবে, জানার চেষ্টাও করবে।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার ১০১টি কারণ দর্শিয়ে অথবা চুপ করে থেকে পার পাওয়া এবং ‘ধমক দিয়ে ছালা কেড়ে নেওয়া’র দিন হাসিনার চলে গেছে বলেই আজকের প্রজন্মের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত