হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জনগণকে জিততে দিন

ইমরান রহমান

রাজনীতির প্রতি এ দেশের মানুষের আকর্ষণ ঐতিহাসিক। কার্যত সাধারণ মানুষই আমাদের রাজনৈতিক রক্তসঞ্চালনের শিরা। সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পেছনে তারাই প্রধান চালিকাশক্তি। আদিকাল থেকে এ দেশের ধর্মীয় ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য জীবনের সর্বস্তর থেকে যে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত ভিন্নমত এবং মতপার্থক্যকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই এখানে ধীরে ধীরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও বহুমাত্রিক রাজনীতির ধারণা বিকশিত হয়েছে। দেড় দশক বাদ দিলে রাজনীতির প্রতিটি পর্যায়ে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।

সাধারণ মানুষের মতে, তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষার জন্য রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। তারা রাজনীতিকে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। এদিক থেকে আজকের সংসদ নির্বাচনটি নানাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় দেড় যুগ পর হতে যাওয়া একটি সম্ভাব্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দেশের সব বয়সের মানুষের মধ্যে সঞ্চার হয়েছে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। কিন্তু তাই বলে এই নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলার সুযোগ কম।

এর আগে বিভিন্ন সময় স্বীকৃত, বিতর্কিত ১২টি সংসদ নির্বাচন হলেও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এটাই প্রথম নির্বাচন, যা পূর্ববর্তী সংসদ নির্বাচনগুলো থেকে বৈশিষ্ট্য এবং পদ্ধতিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্বৈত ভোট, উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষে এরূপ নানা জটিল সমীকরণের এই নির্বাচন বলা যায় এক মহাযজ্ঞ। এদিক থেকে এই নির্বাচন জাতির জন্য একদিকে যেমন বিরাট পরীক্ষা, অন্যদিকে একটি সুবর্ণ সুযোগও। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে, যখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যের দিকে হেলছে, তখন এই নির্বাচনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এর সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্র হিসেবে আগামীতে বাংলাদেশের ভাগ্য কোনদিকে মোড় নেবে।

জুলাই অভ্যুত্থান-পূর্ব দেশের ৫৪ বছরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগাভাগি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির এবারের মূল নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চলেছে দলটির একসময়ের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের তুলনায় বিএনপির অভিজ্ঞতা বেশি ও পরীক্ষিত। বিশাল জনভিত্তি এবং সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে দলটির। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া এ দলটির একাধিকবার এককভাবে সরকার গঠনের ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে।

এদিক থেকে জামায়াতে ইসলামী জুলাই অভ্যুত্থান-পূর্ব সময়ে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই প্রান্তিক ছিল বললে ভুল হবে না। এর আগে সংসদে কিছু আসন পাওয়ার জন্য দলটিকে বিএনপির কাঁধেই ভর করতে হয়েছে। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দমনপীড়নের রাজনীতিই ছিল এর মূল কারণ। তবে হাসিনার পতনের পর এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নাটকীয় উত্থান দেখা যাচ্ছে। এই উত্থানের পেছনে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনীতি যেমন কাজ করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থক শক্তির সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই দলটির গায়ে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কলঙ্ক জুড়ে দেওয়ার আওয়ামী বয়ান বর্তমানে খুব একটা কাজ করছে না। এর একটা বড় কারণ বর্তমানে জনসংখ্যার অধিকাংশই তরুণ। এই তরুণদের প্রায় সবারই জন্ম স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই তরুণদের মনস্তত্ত্ব মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের চেতনার বটিকা গিলিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না। দুর্দমনীয় এই প্রজন্মের রয়েছে নিজস্ব চিন্তাধারা। ফরাসি দার্শনিক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন— ‘Nothing is more powerful than an idea whose time has reached.’ এদিক থেকে যারা পরিবর্তন মানতে পারছেন না, এই তারুণ্যনির্ভর আগামীর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাখ্যান করছে।

দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ড দেশ ও বিদেশে বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। অনেকেই মনে করেন, আদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল করাই ছিল এসব মৃত্যুদণ্ডের লক্ষ্য। এতে আওয়ামী লীগের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী জনগণের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশের সহানুভূতি জামায়াতের পক্ষে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

তৃতীয়ত, জামায়াতে ইসলামী কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় না যাওয়ায় তারা অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর মতো দুর্নীতির অভিযোগ নেই তাদের বিরুদ্ধে। এদিক থেকে তাদের ইমেজ যথেষ্ট স্বচ্ছ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে থাকা জামায়াতের দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কখনোই দুর্নীতির কোনো অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবর্তনকামী মানুষ এ দিকটি আমলে নিচ্ছে কি না—বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাশের দেশ ভারতের ভূমিকার কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। ভারতে মোদি সরকারের প্রায় এক যুগের শাসনামলে ধর্মভিত্তিক, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতির প্রবল বিস্তার ঘটেছে। মোদির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ফলে ভারতে মুসলমানরা যেভাবে নানা ধরনের বৈষম্য, নিপীড়ন ও অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন, তা ‘নেক্সট ডোর’ প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজকে গভীরভাবে আহত ও বিচলিত করছে। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন মুসলিম স্থাপনার নির্বিচার ধ্বংস শুধু ভারতের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিন্ন অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতেও তীব্র আঘাত হেনেছে। শেখ হাসিনার ভারত তোষণনীতির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর ভারতবিরোধী রাজনীতি এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জামায়াত-শিবিরের অগ্রণী ভূমিকাও সাধারণ মানুষের মনে যথেষ্টই দাগ কেটেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যে দলই বিজয়ী হোক না কেন, তাদের জুলাই অভ্যুত্থানের শিক্ষা মনে রাখতে হবে। জনসমর্থন হারালে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না—জুলাই আন্দোলনের এই কঠোর বার্তা যদি আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দল আগের দলীয় সরকারগুলোর মতো ভুলে যায়, তবে তাদের পরিণতিও হবে স্বৈরাচারের মতোই। তাই সবারই প্রত্যাশা, এবারের নির্বাচন আক্ষরিক অর্থেই হোক জনগণের বিজয়ের নির্বাচন।

লেখক : সাংবাদিক ও কবি

কেন শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠল না

নির্মম সত্যের মুখোমুখি

সুষ্ঠু নির্বাচনে পাল্টে যেতে পারে সব হিসাব

নির্বাচন ২০২৬-এর ‘সপ্তাশ্চর্য’ বিষয়

ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যে ফিরে আসুন

নির্বাচন : নৈতিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

নির্বাচনি প্রচারে ‘বাক্যবাণ’ ছুড়ুন, ‘গুলি’ নয়

পায়রা বন্দর : মেগা প্রকল্পের মরীচিকা

ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব কী হবে?

রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণের অগ্নিপরীক্ষা