এ যেন বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালের টাইব্রেকার অথবা বৈশ্বিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে সুপার ওভারের নাটকীয়তা! আজকের বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব উত্তেজনা নেমে আসছে আজ ১২ ফেব্রুয়ারি দিনটির শেষ ভাগে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণও যেন হয়ে পড়েছে বড়জোর সারাদিনের কারবার, যদিও নির্বাচন ব্যাপারটি কোনোভাবেই মাত্র এক দিনের মামলা নয়।
শেষ পর্যন্ত ভোটের প্রক্রিয়া কেমন হচ্ছে এবং ফল কী দাঁড়াচ্ছে, এসবের বাইরে এবারের নির্বাচন কেন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, সে প্রশ্ন হয়তো জোরেশোরেই আসবে অদূর ভবিষ্যতে।
প্রার্থীদের গুণ বিচার এবং ভোটারদের উপস্থিতির হিসাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হোক না হোক, প্রায় দুই দশক পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু, কারচুপিহীন এবং নিপীড়নমুক্ত সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, দুবছর আগেও তো সে আশা ছিল অধিকাংশের কল্পনার অতীত।
সেই ঐতিহাসিক সুযোগ যখন এসেছে, তখন জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বিপ্লব-পরবর্তী নতুন প্রেক্ষাপটের এই নির্বাচন আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি পুরোনো চিন্তা দিয়ে। প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার-প্রচারণা, ভোটগ্রহণ ও ফল প্রকাশ নিয়ে আমাদের সাধারণ জ্ঞান ও কল্পনার ঊর্ধ্বেও ২০২৬-এর নির্বাচন আলাদা করে রাখবে ভিন্ন কিছু বিষয়, যা হয়তো আশ্চর্যজনকও। এ ব্যাপারে ভোট সমাপ্ত হওয়ার আগে, এখন পর্যন্ত এই লেখকের পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপÑ
অনিশ্চয়তার গুজব, নীরব ভোটার : অতীতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে আমাদের দেশে ঘটনা ঘটার আগে জনসমক্ষে এর খবর নিয়ে হাজির হয় গুজব। আবার সত্যকেও অনেকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন গুজবের দোহাই দিয়ে। তাহলে কি প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ২০২৬-এর ভোট, নির্বাচন না-ও হতে পারে বলে গুজবকে মিথ্যা প্রমাণ করছে?
হতে পারে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা সত্যি সত্যিই ছিল; তার চেয়েও অধিক সত্য হলো হঠকারিতা, ষড়যন্ত্র এবং নাশকতা করে নির্বাচন ভন্ডুল করার ব্যর্থ চেষ্টা।
নির্বাচন অনুষ্ঠান, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহ এবং ভোট দেওয়ার উৎসাহ বোধ হয় বাকি অনিশ্চয়তাকে জয় করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু নতুন বাস্তবতায় ভোটারদের কিছুটা নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। অনেক আগের সুষ্ঠু নির্বাচনগুলোর মতো জনগণের অবস্থান স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না এবার। সে হিসেবেও নির্বাচনি অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও গুঞ্জন থেকেই যাচ্ছেÑযতক্ষণ না এটা শেষ হচ্ছে।
প্রথম মাল্টিমিডিয়া নির্বাচন : এমনিতেই ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর তিন তিনটি সংসদ নির্বাচন এবং সে সময়ের স্থানীয় সরকার নেতৃত্ব নির্বাচন জনগণের অংশগ্রহণে হয়নি, তাই এবারের নির্বাচনে পোস্টার না থাকায় মানুষ যেন নির্বাচনি আমেজ খুঁজে পাচ্ছিল না। অথচ আগে থেকেই নির্বাচনকেন্দ্রিক গণসংযোগ চলছিল এবং ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার চলে এসেছে।
দীর্ঘকালের অভ্যাস ও সামাজিক প্রথার কারণে আমরা ধরে নিয়েছিলাম নির্বাচন মানেই চারদিকে উৎসব এবং প্রচার-প্রচারণার ‘গমগম’ আওয়াজ। কিন্তু এবার এই প্রচার স্থান পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। মোবাইল ফোনসহ ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন প্রার্থীরা।
এই ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় অনুপস্থিত ছিল হৃদয়ের উষ্ণতা; তাই বলে তৃতীয় পক্ষের সমালোচনা, যুক্তিতর্ক বা প্রোপাগান্ডা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়নি। পুরোনো চিন্তার মানুষ এতে খাপ খাওয়াতে সংগ্রাম করেছেন কিন্তু শহরে, গ্রামে, গঞ্জেÑসর্বত্রই ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে। এর প্রভাবে অধিকাংশ ভোটার সিদ্ধান্ত নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিভ্রাট : প্রার্থীদের ভোট পাওয়া এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার তাগিদ থেকেই সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে বেশি। কিন্তু একই দিনে গণভোট আয়োজন করায় ততটা মনোযোগ পায়নি জুলাই সনদ, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে গণরায়ের ইস্যুটি।
সনদে সই করা প্রতিযোগী দলগুলো নিজস্ব প্রার্থীদের হারা-জেতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নৈতিক যুক্তি কম এসেছে। ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর গুরুত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মীরাও ঝামেলায় পড়েছেন, যখন দেখেছেন যে গণভোটে তাদের অবস্থান দলীয় প্রার্থীদের ভোটপ্রাপ্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। গণভোট বিষয়ে অস্পষ্টতা এবং জুলাই সনদের রাজনৈতিক মালিকানায় ঘাটতির অভিঘাত থাকবে ভোট প্রদান ও আগামী রাজনীতিতে।
পলাতক হাসিনার ভৌতিক উপস্থিতি : পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বর্জন করছেন! একটি নিষিদ্ধ দল কী করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বর্জন করতে পারে, সে প্রশ্ন অনিবার্য। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনমুখী দল এবং এবারও এর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করবে বলেন শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপির দায়ে দেশ ও সারা বিশ্বে নিন্দিত শেখ হাসিনা চাইছেন ভোটার উপস্থিতি কম হোক।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী সমর্থক বা ভোটব্যাংকের আশীর্বাদ আশা করছে। এই গোষ্ঠী বাস্তবে একই দিকে ভোট দেবে না এবং অনেকে ভোটকেন্দ্রেই যাবে না। সংসদ নির্বাচনে ভোট দিলেও আওয়ামী ভোটারদের গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আবার, এই অনুমান জুলাই চেতনার পক্ষের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো যুক্তি দাঁড় করা এবং সেগুলো যার যার চ্যানেলে মানুষকে জানাতে। মোটকথা, এই নির্বাচন হাসিনার নাম উচ্চারণ না করে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।
অদৃশ্য শক্তির বোধগম্য প্রভাব : বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে যেসব শক্তি ভূমিকা রাখে; কিন্তু যাদের প্রকাশ্যে দেখা যায় না, তাদের মধ্যে রয়েছে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে অর্থায়নকারী ব্যক্তি ও করপোরেট সত্তা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বা ডিপ স্টেইট এবং প্রভাবশালী দেশের দূতাবাস, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা। এগুলো ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় বাগাড়ম্বর হিসেবে, বস্তুনিষ্ঠভাবে নয়।
জুলাই বিপ্লবের পর এবারের নির্বাচনের দৃশ্যপট এবং এদের ভূমিকা একটু ভিন্ন। দেশীয় অরাজনৈতিক খেলোয়াড়রা ঐক্যবদ্ধ নয় এবং তাদের একক স্বার্থ কম, যদিও তারা বসে থাকার পাত্র নয়। বিদেশি শক্তিগুলোর ভূমিকা বা চাওয়া না বোঝার কারণ নেই। ভারতের মিত্র আওয়ামী লীগ বিদায় নেওয়ায়, দিল্লি বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে নতুন পাত্র ও সুযোগের অপেক্ষায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং চীনের ক্রমবর্ধমান বহির্মুখী নীতি ঢাকার নির্বাচন-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির ভাবনার বিষয় হবেই। এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের শক্তিগুলোরও নজর থাকবে বাংলাদেশের ওপর। সুতরাং, এই নির্বাচনে বিভিন্ন বিদেশি শক্তির নীরব কূটনৈতিক কার্যক্রম নিশ্চয়ই থাকবে।
নতুন প্রজন্ম, সমীকরণ পরিবর্তন : বিদেশি শক্তি কিংবা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্লেয়াররা খেয়াল করুক বা না করুক, এ দেশে সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পর একটি প্রজন্মান্তর ঘটেছে। ফ্যাসিবাদে ছেদ পড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আবির্ভূত হয় ২০২৪-এর বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ও অংশগ্রহণকারী তরুণরা। তারা নির্বাচনি ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এখনো অধরা শক্তি।
অনেক বছর দেশে সর্বদলীয় এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোয় কর্মী নিয়োগ কার্যত বন্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে ভোটের অঙ্ক কী দাঁড়াচ্ছে, তা আগে থেকে মেলানো কঠিন। তবে, বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি সম্ভবত চিরদিনের জন্য পাল্টে গেছে।
পরবর্তী রাজনৈতিক মেরূকরণের আভাস : এবারের নির্বাচন যেন কোনো অংশীজনেরই প্রত্যাশা ও ধারণার সঙ্গে মিলছে না। জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রার্থীদের ক্যারিশমা, প্রচার-প্রচারণার ধারা, সম্ভাব্য ফলÑকিছুই ঠিক গাইড বইয়ের প্রশ্নপত্রের মতো আর ‘কমন’ পড়ছে না।
ধারণা করছি, এই নির্বাচনের ফলে কিছু ‘চমক’ থাকবে, যা কারো কারো কাছে যুক্তিগ্রাহ্য মনে না-ও হতে পারে। নির্বাচনে জয়লাভ করাটা কারো অধিকার নয়; বরং অনাকাঙ্ক্ষিত ফল গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া। কে জিতবে, কে হারবে, তার চেয়ে বড় কথা, ২০২৬-এর নির্বাচন হবে দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ধারা ও মেরূকরণের সূচনা।
লেখক : সাংবাদিক