ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ দেশের মানুষ ইতিহাসের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়েছে। মূলত বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রশক্তি পরিচালিত নিবর্তনমূলক শাসন এবং ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক আচরণের ফলে এমন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যা অনেকের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই পটভূমিতে কয়েকটি বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন : প্রথমত, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নির্বাচন করতে না পারা। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে ৫৪ বছর ধরে সমালোচিত জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে এই প্রথম আলেম-ওলামাসমৃদ্ধ একটি ইসলামি জোট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা আগে কখনো ঘটেনি।
বিষয়টি আরেকটু গভীরে গিয়ে আলোচনা করা দরকার। একবার ভেবে দেখুন, যে দলটি স্বাধীনতার সংগঠক হিসেবে নিজের গৌরবকে মহীয়ান করার লক্ষ্যে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে এসেছে, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে উদ্যত হয়েছে বারবার, সেই আওয়ামী লীগ আজ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। অন্যদিকে, যাদের স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকার বলে ধিক্কার দিয়ে আসা হয়েছে; কিংবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১-দলীয় ইসলামি জোটের এভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতি প্রেক্ষাপটে এক বিস্ময়কর ঘটনা। যদিও জামায়াতে ইসলামী অতীতে অনেকবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে; কিন্তু নেতৃত্ব দিয়ে একটা বড় জোট করে এভাবে মূলধারায় উপনীত হওয়ার ঘটনায় এই প্রথম।
এটা কোনো দল বা জোটের পক্ষপাতিত্ব করার বিষয় নয়। মূলত স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর ধরে কীভাবে ভেতরে ভেতরে আমাদের রাজনীতিতে কতটা ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, সেটি নিয়ে আলোচনা করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। শুধু ঘৃণা ও বিদ্বেষের ওপর নির্ভর রাজনীতি যে কতটা ভুল প্রমাণিত হতে পারে, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বর্তমান ঘটনাবলি। আমাদের জানা মতে, যেসব মুসলিম দেশে উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘদিন বিরাজ করেছে, সেসব দেশেই ইসলামপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। সেটি আমরা দেখেছি, আলজেরিয়ায়, তুরস্ক, আফগানিস্তান, মিসর ইত্যাদি অনেক মুসলিম দেশে। বর্তমান বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়।
এটি সত্য, মানুষ অপমান ও বঞ্চনার থেকে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে আর অপমানের প্রতিশোধ নিতে জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। আমাদের দেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে বঞ্চনা ও অপমান বোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর আবার সেই বঞ্চনা ও অপমানের মধ্যে পড়তে হবে, তা এ দেশের মানুষ কল্পনাও করেনি। বরং সাধারণ মানুষ দেখেছে কীভাবে বছরের পর বছর ধরে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর হাজার হাজার সন্তান শুধু দাড়ি-টুপির কারণে বঞ্চনা ও অপমান ভোগ করে আসছে। এই যে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী উগ্র ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা মাদরাসায় অধ্যয়নরত সমাজের অতিদরিদ্র অংশের সন্তানদের ওইসব অভিধা দিয়ে যেভাবে অপমান ও অপদস্থ করে এসেছে, তারই অবধারিত বিস্ফোরণ হচ্ছে জুলাই বিপ্লব এবং বর্তমান মেরূকরণ। এটি সবার মনে রাখা উচিত, যিনি অপমান করেন তিনি হয়তো ভুলে যান, কিন্তু যিনি অপমানিত হন, তিনি কখনো ভোলেননি।
কেন যেন এ দেশের রাজনীতিবিদরা ঘটনার কারণ পর্যালোচনা না করে শুধু ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ভিত্তিতে চলতে পছন্দ করেন। যার ফলে ভুলের পর ভুল চলতেই থাকে। যেমন : আওয়ামী লীগ নেতারা কখনো এটা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি যে, কেন স্বাধীনতার পর এত দ্রুত সময়ে জনগণ আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন, যে কারণে ৭৩ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিতে হলো। কিংবা ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন বিএনপি নামক নবগঠিত রাজনৈতিক দল এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। শুধু কি এসবের পেছনে ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল?
পরে আওয়ামী লীগ নেতারা ষড়যন্ত্রতত্ত্বকেই সম্বল করে রাজনীতি চালিয়ে গেছে। যেমন : জুলাই বিপ্লবকালে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যা করার ঘটনাকে আওয়ামী লীগ নেতারা নিছক ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। এ রকম একটি ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডকে যারা নিছক ষড়যন্ত্র বলে দায় এড়াতে চেষ্টা করেন, তারা কখনোই শোধরাতে পারবেন না।
এ কারণেই তারা বুঝতে চেষ্টা করেননি যে, কেন বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের সন্তানদের জেনারেল লাইনে না পড়িয়ে মাদরাসায় পড়িয়ে থাকেন। মূলত সামাজিক পশ্চাৎপদতা এবং অভাব-অনটনের কারণে তারা মাদরাসায় পড়ান। রাষ্ট্রের অবজ্ঞার স্বীকার এই শিশুরা বুঝে ওঠার সূচনালগ্ন থেকেই রাজাকার নিন্দা নিয়ে বড় হতে থাকে। অথচ তাদের অনেকের বাবা-মায়ে জন্ম হয়েছে স্বাধীনতার পর। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অপমান তাদের অন্তরে গেঁথে থাকে ভবিষ্যতের প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে। তারা দেখেছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর নিরস্ত্র সন্তানদের কতটা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। তাই আমরা দেখেছি, জুলাই বিপ্লবের সময় এই মাদরাসার ছাত্ররাও কতটা ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমেছিল।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ এমন উগ্র ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি চাপিয়ে দিয়েছিল, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাস্যকর ছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করতেন, কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ইসলাম থাকলে সেটা সাম্প্রদায়িক। তাই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে মুসলিম ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। বাদ দেওয়া হয়েছিল পুরান ঢাকায় অবস্থিত নজরুল ইসলাম কলেজের ইসলাম। এসব ছাড়াও একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ওয়াজ মাহফিল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বলা যায়, আওয়ামী লীগ তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের স্টাইলে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ সূচনা করেছিল। আতাতুর্ক তুরস্কে সব ধরনের ইসলামি আকিদাসহ মাদরাসা ও মসজিদ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে নামাজ পড়ানোর ইমাম পর্যন্ত সেখানে পাওয়া যেত না। সেই অনুকরণে কতটা কঠোর ছিল, সেই সময়কার বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি তো এখন ভাবতে অবাক লাগে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এই নীতির পরিবর্তন ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর।
এরই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সময় এ দেশের আলেম-ওলামারা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সম্মানের সঙ্গে ওয়াজ মাহফিলসহ ইসলামি তৎপরতা চালানোর সুযোগ পান। বলা যায়, সেই থেকে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামিক দল স্বগৌরবে নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করে একটি মুসলিম দেশের গৌরব তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ইসলামি মূল্যবোধ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে সমন্বয়ে ঘটিয়েছিলেন। সে কারণে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি সবসময় ইসলামপন্থিদের ভোট পেয়ে এসেছে।
এবার ঘটনা অন্যরকম হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনি মাঠে না থাকায় প্রায় একই ঘরানার ভোটারদের নিয়ে চলছে টানাটানি। দেখেশুনে মনে হচ্ছে বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের মধ্যে ১১-দলীয় জোট হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। শুরু দিকে মনে হচ্ছিল, বিএনপির পক্ষে একপেশে ভোট হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে বর্তমানে কিছুটা সংশয় দেখা দিলেও ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবে বিএনপির সুবিধা অনেক। যদিও ভোটারদের নীরবতা এক ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনার সূচনায় শুরু করেছিলাম, তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, একদা যেসব আলেম-ওলামা ও ইসলামি দল জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিল, তারাই আজ জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এটা বিরাট একটা পরিবর্তন। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠন করার সময় দেখেছি বিরোধের মাত্রা কোন পর্যায়ে ছিল। ইসলামী ঐক্যজোটের প্রধান মুফতি ফজলুল হক আমিনী কোনো অবস্থাতেই জামায়াতের সঙ্গে জোটে সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছিলেন না। দিনের পর দিন আলোচনা হয়েছে, আমিও দু-একটি আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিলাম। অবশেষে মুফতি আমিনী সাহেব জোটে অন্তর্ভুক্ত হন। হয়তো তখন থেকেই বরফ গলতে শুরু করেছিল। এখন ইসলামি দলগুলো নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এখন এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে যে, যারা এই ইসলামি দলগুলোর কাঁধে জঙ্গিবাদের তকমা লাগাতে চান, তারা তা করে থাকেন নিছক রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকে। কারণ এই ইসলামপন্থিরা কখনোই ভূরাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে আলজেরিয়া আফগানিস্তানের মতো সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারবে না। কারণ আমরা তিন দিক ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত আর ঘনবসতিপূর্ণ এ রকম সমতল ভূমিতে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ অসম্ভব। ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তরের শুরুতে এ দেশের কমিউনিস্টরা পশ্চিম বাংলার সশস্ত্র নকশালবাড়ী আন্দোলনের অনুকরণে এ ধরনের একটা যুদ্ধ বাংলাদেশে সূচনা করেছিল। কিন্তু উভয় অংশেই তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। বরং ইসলামি দলগুলোকে যত বেশি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত রাখা যায়, ততই কল্যাণকর। যেমনটা তুরস্কের ঘটেছে। সেখানে কঠিন ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের অধীনে ইসলামপন্থিরা ধীরে ধীরে সমন্বয় ও সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু মিসরে ইসলামপন্থিরা নির্বাচনি বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাড়াহুড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। অন্যদিকে আলজেরিয়ায় ইসলামপন্থিরা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি গঠন করতে দেওয়া হয়নি। অবশ্য সেটি অন্য বিষয় পরে আলোচনা করা যেতে পারে। পৃথিবীতে ওইসব দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইসলামি দলগুলোর অগ্রগতি ঘটেছে একটু উদার ও নরমপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে, যেমনটা তুরস্কে ঘটেছে, যা আগেই উল্লেখ করেছি। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে ইসলামি জোট কতটা সফল হতে পারে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক