স্থায়ী কমিটির বৈঠক
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ধীরে ধীরে চাপ বাড়াবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরই অংশ হিসেবে ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানো এবং ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচার দাবি- এই দুই ইস্যুতে ইতোমধ্যে রাজপথে লাগাতার কর্মসূচি দিচ্ছে দলটি।
এর মাধ্যমে দলটি তাদের রাজনৈতিক শক্তি দেখানোর পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলনও জোরদার করতে চায়। তবে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে এখনই কোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হোক সেটাও চায় না দলের শীর্ষমহল।
গত সোমবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই দুই ইস্যু, সংসদ নির্বাচন ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হয়।
জানা গেছে, ইশরাক ও সাম্য ইস্যুতে আন্দোলন জোরদার করার জন্য গতকাল বিকালে ঢাকা মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ বুধবার থেকে এই দুই কর্মসূচিতে জনসমাগম আরো বাড়াবে দলটি।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ৯ মাসেও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষিত না হওয়ায় অসন্তোষ জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, সরকারের মধ্যে কতিপয় স্বার্থান্বেষী চক্র নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক রাজনীতি করছে। ফলে নানা ঘটনায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের দাবিতে হয়তো সরাসরি কোনো কর্মসূচি আসবে না। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিতে সরকারের ওপর ধীরে ধীরে চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের যৌক্তিকতার বিষয়টি বর্তমানে দলটি যেভাবে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরছে, সেটিও অব্যাহত রাখবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা সরকারকে সময় দিচ্ছি, সুযোগ দিচ্ছি। তার মনে এই নয় যে, এই ধৈর্য অনন্তকাল থাকবে।’
স্থায়ী কমিটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে বিভিন্ন এজেন্ডা থাকলেও মূলত দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, বিভিন্ন পক্ষ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে হঠাৎ করে মাঠে নামায় এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অবনতিশীল।
বিএনপির এক নেতা বলেন, সরকারকে বিপদে ফেলতে নানা চক্রান্ত চলছে। সম্প্রতি অতীব গুরুত্বপূর্ণ নয়Ñ এমন কিছু ইস্যু নিয়ে হঠাৎ করে নানা পক্ষের মাঠে আন্দোলনে নামার ঘটনাকে সন্দেহজনক। পতিত স্বৈরাচারের লোকজনও হঠাৎ রাজপথে মিছিল করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা সরকারকে বিপদে ফেলতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। সরকারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। বিএনপির নেতারা মনে করেন, এমন নিত্যনতুন দাবি আদায়ে রাজপথে নামা, এর মধ্য দিয়েও সামনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। বিএনপির কারো কারো শঙ্কাÑ রাষ্ট্রপতি অপসারণ, সংবিধান বাতিল, গণভোট, স্থানীয় সরকার নির্বাচনÑ এই ইস্যুগুলোতে তারা (এনসিপি) ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সরকার সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি না কিংবা সরকারের অবস্থান তখন কী হয়Ñ সেটি নিয়েও তাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। তিনি বলেন, ‘গোত্রে গোত্রে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরস্পরের মুখোমুখি করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’
সরকার সংস্কার ও নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে বলে আলোচনা তুলে কেউ কেউ বৈঠকে বলেন, এতে সরকারের ভেতর ও বাইরের একটি চক্রের ইন্ধন আছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকারের একটি প্রভাবশালী অংশ বিরাজনীতিকরণ বা তাদের মদদপুষ্ট একটি দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছে। তাদের এই চেষ্টা সফল হলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা নির্যাতনে সম্পৃক্ত ছিল না তাদের বিএনপিতে যোগদানের বিষয়টি বৈঠক শুরু হওয়ার আগে আলোচনা হয়। আওয়ামী লীগের নেতাদের বিএনপিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে যে বক্তব্য এসেছে তাতে অধিকাংশ নেতা নেতিবাচক মনোভাব দেখান।
সোমবার রাত সাড়ে ৮টায় বৈঠকটি শুরু হয়ে সাড়ে ১১টার দিকে শেষ হয়। বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এমবি