বিশ্লেষণ
প্রতিপক্ষ যখন জিম্বাবুয়ে তখন তো বাংলাদেশ সেখানে ফেভারিট। জেতার কথা তো আমাদের। কিন্তু সিলেট টেস্ট জিতে নিল জিম্বাবুয়ে। এই হারে আরো অনেকের মতো অবশ্যই আমরা কষ্ট পেয়েছি। এটা লজ্জাজনক বিষয়। তবে সত্যি বলতে কি, আমি খুব বেশি অবাক হইনি। কারণ নিকট অতীতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ভালো নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে জিম্বাবুয়ে টিমটা দুর্বল, ওরা শেষ চার বছরে কোনো টেস্ট ম্যাচ জিততে পারছিল না। এসব কিছু বিবেচনা করে আমরা চিন্তা করেছিলাম হয়তোবা আমরা জিতে যাব। কিন্তু এজন্য তো আমাদের পারফরম্যান্স করতে হবে। পারফরম্যান্স করে জিততে হবে। এই টেস্ট ম্যাচে আমরা কী খেলছি, কীভাবে আছি, আমাদের পুরো টেস্ট যদি চিন্তা করি, কোন জায়গায় আমরা ডমিনেটিং ক্রিকেট খেলেছি? ব্যাটিং, বোলিং কিংবা স্পিন ডিপার্টমেন্ট বলি, একমাত্র মিরাজের পারফরম্যান্স কিছুটা পার্থক্য গড়েছে। দুই ইনিংসেই ভালো বোলিং করেছে।
প্রশ্ন হলো, বাকিরা কী করেছেন?
তাইজুল প্রথম ইনিংসে একেবারেই ভালো করতে পারেনি। দ্বিতীয় ইনিংসে মোটামুটি ভালো করেছে। আবার নাহিদ রানা প্রথম ইনিংসের মতো ভালো করতে পারেনি। বোলিং ইউনিট হিসেবে যদি চিন্তা করেন তাহলে আমাদের বোলাররা নিকট অতীতে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছে। ওই পারফরম্যান্সটা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দেখা যায়নি। বলতে পারেন দলগতভাবে দেখা যায়নি। একজন ভালো করলে আরেকজন করেনি।
ব্যাটিংয়ে আমাদের ওপেনাররা চরম বাজে পারফরম্যান্স করেছে। ওদের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানি ছাড়া কিন্তু বাকি কেউ এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু না। কিন্তু আমাদের ওপেনাররা ওদের বিপক্ষে সেভাবে পারফর্ম করতে পারেনি। মিডল অর্ডারে আমরা যাদের ওপর নির্ভর করি, মমিনুল, শান্ত কিছুটা রান করেছে। তবে টেস্ট ক্রিকেটে এই রান একটা দলের জন্য বা একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে কিংবা সেট হওয়ার পর যেমন করা দরকার ছিল সেটা হয়নি। ওদের ইনিংসগুলোর মধ্যে একটা যদি ১০০ কিংবা ১২০ রানের মতো হতো তাহলে কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে যেত। সেটা দেখতে পারিনি। মুশফিকুর রহিমও একেবারে ফর্মে নেই। সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে যে ধরনের পারফরম্যান্স দরকার সেটা টপঅর্ডার, মিডলঅর্ডার বা শেষের দিকের ব্যাটারদের কথা বলেন ওই ধরনের পারফরম্যান্স বাংলাদেশ করতে পারেনি। আমরা এমনি এমনি তো আর ম্যাচ জিতে যাব না। পারফরম্যান্স করে ম্যাচ জিততে হবে। আমার মনে হয়, কোনো জায়গাতেই ম্যাচ জেতার মতো পারফরম্যান্স আমরা করতে পারিনি।
সিলেটে ব্যর্থতার পর দেখলাম দলে দুটি বদল এসেছে।
আমরা সবসময় কালকের ম্যাচ বা পরের সিরিজটা নিয়ে চিন্তা করি। আমরা কখনো লম্বা সময়ের জন্য চিন্তা করি না। আমরা কিন্তু জানি আমাদের প্রথম শ্রেণি বা ঘরোয়া ক্রিকেটের মানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আমাদের অনেক ক্রিকেটার ঘরোয়াতে দারুণ পারফরম্যান্স করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিমণ্ডলে এসে সে পারফর্ম করতে পারছে না। এর কারণ কী?
অবশ্যই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে পিছিয়ে। এই পার্থক্য বা শূন্যতা পূরণের জন আমরা লম্বা সময়ের জন্য চিন্তা করতে পারি না। আমরা হঠাৎ একটি দুটি পারফরম্যান্স পেলে সবকিছু ভুলে যাই। মনে করি আমরা ভালো ট্র্যাকেই আছি, ভালো অবস্থানেই আছি বা নেক্সট ম্যাচে আরো ভালো করব এই চিন্তা করি। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে আমরা ধারাবাহিকভাবে এক বা দুই বছর ভালো করেছি এমন হয়নি। কারণ হলো আমাদের ভিত্তি শক্ত না। যতদিন ওই ভিত্তি শক্ত না হবে, ভিত্তি শক্ত করার জন্য শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই।
বিশ্ব ক্রিকেট পরিবর্তন হয়ে গেছে। স্পোর্টস সায়েন্সের সঙ্গে রিলেটেড হয়ে গেছে। এসব জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা মনে করি একজন খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসে অটোমেটিক পারফরম্যান্স করবে। কিন্তু ওদের তৈরি হওয়ার যে প্রসেস, টেকনিক্যালি, ফিজিক্যালি কিংবা মেন্টালি বলেন, যেভাবে তৈরি হয়ে এলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো করা যাবে, আমার মনে হয় না আমরা সে প্রসেসে আছি। শুধু তা-ই নয়, খেলোয়াড় তৈরির জন্য আমাদের ভালো কোচের দরকার। আমার মনে হয় না আমাদের সেই মানের কোচ আছে। এজন্য বিসিবিকে নিজের দিক থেকেই ভালো মানের কোচ তৈরিতে কাজ করতে হবে।
সানোয়ার হোসেন
জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার