নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
ইরানে যুদ্ধ শুরু করার আগে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক বাহিনীর কমান্ড, একটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজসহ একটি নৌবহর দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করে। চলতি সপ্তাহে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে এশিয়া থেকে উন্নত প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে এনেছে পেন্টাগন।
এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে, যা এশিয়ায় শুধু এ দেশটিতেই মোতায়েন ছিল। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী আমেরিকার এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উত্তর কোরিয়ার হামলা থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষার জন্য মোতায়েন ছিল। প্রথমবারের মতো সিউলের কাছ থেকে প্রতিরোধের এ অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হলো।
মাত্র দুই সপ্তাহের ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি চাপের মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাবকে দুর্বল করবে বলে মনে করছেন ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে তা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত পতন সম্পর্কে চীনের প্রচারের সত্যায়ন এবং মাঝারি স্তরের শক্তিগুলোর মধ্যে অস্ত্রের প্রতিযোগিতাকে জোরদার করবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সমরাস্ত্র মজুত কমে আসা ও মনোযোগ বিচ্যুতকারী আক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন যা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব ফেলছে। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা চীনের ক্রমেই বাড়তে থাকা সামরিক ও আক্রমণাত্মক মহড়া মোকাবিলায় বিভিন্ন দিক থেকে ঘাটতি অনুভব করছে।
মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়াং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, তার সরকার পেন্টাগনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থানান্তরের বিরোধিতা করলেও, এটি অনিবার্য এক বাস্তবতা যার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে এশিয়ায় তিনটি পরিবর্তন এসেছে।
প্রথমত, গত বছর সিঙ্গাপুরে এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছিলেন, এ অঞ্চলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গভীর মনোযোগ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমাদের বন্ধুদের সামরিক সহায়তা আমরা অব্যাহত রাখব।’
এ বিষয়টি এখন বিভিন্ন দেশেরই বিশ্বাস করা কঠিন। বিশেষ করে যখন পরমাণু শক্তির অধিকারী উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী মিত্র থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে কাজ করা ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রতিরক্ষা সহকারী মন্ত্রী অ্যালি রেটনার বলেন, ‘কোরিয়া থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে এমন সময়ে ভয়াবহ এক সংকেত দেওয়া হলো, যখন এশিয়া সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের নড়বড়ে প্রতিশ্রুতিতে ইতোমধ্যে সিউলে বিপুল উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।’
রেটনার জানান, ২০১৭ সালে সিউলে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। এর জেরে নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ তুলে চীন দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য বয়কট করে এবং দেশটিতে পর্যটনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার চাপ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলে অর্থনৈতিক উন্নতি করা এশিয়ার দেশগুলোর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এশিয়ার দেশগুলোর শেয়ারবাজারে পতন অব্যাহত রয়েছে। ফিলিপাইনের মতো আমেরিকার মিত্রকে তেলের বরাদ্দ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। এর ফলে তারা চীনের জন্য নিজেদের দরজা খুলে দিয়েছে। এ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে চীন নিজের প্রভাবকে শক্তিশালী করতে পারে।
কূটনীতিকরা উদ্বিগ্ন যে, যুদ্ধের ফলে বেইজিং এ অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব আরো মুক্তভাবে বিস্তার করতে পারবে। যদিও তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের তৎপরতা এখন শান্ত রয়েছে, সেখানে ও অন্য অঞ্চলেও বেইজিংয়ের নৌবাহিনী ব্যস্ত রয়েছে।
গত বছরের শেষ থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে ভিয়েতনাম উপকূলে পারাসেলস দ্বীপপুঞ্জে নজরদারি পোস্ট তৈরির কাজ শুরু করে। ওপেন সোর্স সেন্টারের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এ অঞ্চলে চীনের জাহাজ নিয়মিত অবস্থান করছে।
জাপানের অবস্থানও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশটির সঙ্গেও চীনের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে। জাপানের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। অর্থনীতির পাশাপাশি সামরিক সংকটও টোকিওর জন্য বাড়তি বিপদ হয়ে দেখা দেবে।
টোকিওর সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো সুনেও ওয়াতানাবে বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণভাবে দুঃস্বপ্ন। ট্রাম্পের অধীনে যেকোনো পরিস্থিতিই হতে পারে বলে জাপান মনে করে। আমাদের আরো শোচনীয় চিত্রের বিষয়ে ভাবনা থাকা উচিত।’
তৃতীয়ত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সমরাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মেশিনের অনেকখানি ঘাটতি রয়েছে। এই সামরিক হিসাবনিকাশ দেশটির অনেক মিত্রকেই ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য হয় ৪০ লাখ ডলার। পুরো ২০২৫ সালে আমেরিকা সবমিলিয়ে মাত্র ৬০০টি এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। কিন্তু দুই সপ্তাহের যুদ্ধেই এক হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়ে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের আহ্বানে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র কিনতে রাজি হয়েছে, ইরান যুদ্ধ যেন তাদের জন্য সতর্কতা তৈরি করেছে। দেশগুলো উপলব্ধি করছে, তারা সহসাই ওয়াশিংটনের কাছ থেকে চাহিদামতো সমরাস্ত্র পাচ্ছে না। গত জানুয়ারিতে জাপান সরকারের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাঁচ বছর আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ৭২০ কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছিল টোকিও। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সমরাস্ত্র তখন পর্যন্ত পায়নি দেশটি।
এর জেরে বিভিন্ন দেশ নিজস্ব সমরাস্ত্র শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামবে। জাপান এর মধ্যে নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণে গত অক্টোবরে আমেরিকার অনুমোদন নিয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে দেশটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এক ধাপ এগিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়াং বলেন, এ যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতার গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে।
এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে।