আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি ছিলেন দেশের সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি সৃষ্টি করা হয়। যার নেতৃত্বে এটি হয়, সেই আয়াতুল্লাহ খোমেনি ১৯৭৯ সালের তেসরা ডিসেম্বর প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ পান।
ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু থেকে শুরু করে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি পরিষদ সাময়িকভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ইরানের সংবিধানের ৫৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার তিন ভাগে বিভক্ত: আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন। এই তিনটি সংস্থা সংবিধানের বিভিন্ন বিধান অনুযায়ী উম্মাহর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে পরিচালিত হয়।
যদিও ইরানের রাজনীতি বহুমাত্রিক, তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও ইসলামী বিপ্লবের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রথম দিন থেকেই সর্বোচ্চ নেতার পদ জনমত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে।
সংবিধানে নেতার ওপর নজরদারি ও মতপ্রকাশের সুযোগ থাকলেও, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে ধরা হয় এবং তার বিরোধিতা করা মানে বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরানের সংবিধানের ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ১২ সদস্যের মধ্যে ছয় জনকে সর্বোচ্চ নেতা মনোনীত করেন এবং ১৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন।
সর্বোচ্চ নেতার পদের গুরুত্ব
১১০ অনুচ্ছেদ তাকে এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রের সাধারণ নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়, পাশাপাশি পুরো শাসনব্যবস্থা তদারকের ক্ষমতাও দেয়।
নেতা গণভোট ডাকার ক্ষমতা রাখেন।
তিনি ইরানের সব বাহিনীর, বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডের প্রধানদের নিয়োগ করেন এবং যুদ্ধ ঘোষণা করার একমাত্র এখতিয়ারও তার।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিজয়ীর নিয়োগপত্রও সর্বোচ্চ নেতা জারি করেন।
তিনি প্রেসিডেন্টকে অপসারণের ক্ষমতাও রাখেন—তবে কেবল তখনই, যখন প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্টকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন বা পার্লামেন্ট ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণা করে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে নেতার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়।
সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবশ্য গার্ডিয়ান কাউন্সিলের পরামর্শ নেওয়া হয়।
সর্বোচ্চ নেতাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান নিয়োগের ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
তিনি বিচার বিভাগ কর্তৃক দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা করার ক্ষমতাও রাখেন। এছাড়া তিনি চাইলে নিজের কিছু ক্ষমতা অন্য কাউকে অর্পণ করতে পারেন।
সংবিধানের ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রীদের সহায়তায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন—তবে সংবিধান যে নির্বাহী ক্ষমতাগুলো সর্বোচ্চ নেতার জন্য সংরক্ষণ করেছে, সেগুলো বাদে। বাস্তবে সর্বোচ্চ নেতা সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে অর্পণ করে থাকেন।
সর্বোচ্চ নেতা এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনী
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—এর স্থল, নৌ ও বিমান শাখা এবং কুদস ফোর্স অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি প্রচলিত সামরিক বাহিনী বা 'আর্মি অব ইরান'ও দেশের সামরিক শক্তির অংশ।
এ সব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সর্বোচ্চ নেতা এবং তাদের কমান্ডারদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাও তার।
ইরানে 'বাসিজ' নামে পরিচিত এক কোটিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল 'ইসলামী বিপ্লবকে সুরক্ষা দেওয়া'। সরকারি নাম 'বাসিজ অর্গানাইজেশন ফর দ্য অপপ্রেসড'।
এটি প্রথমে স্বাধীন একটি সংস্থা ছিল, তবে পরে বিপ্লবী গার্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর প্রধানকেও সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করেন। বাসিজের প্রশাসনিক কর্মীরা রাষ্ট্রীয় বেতনে কাজ করেন, তবে সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন।