ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো বাতাসে পথ ভুলে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়লে বাংলাদেশি দুটি মাছ ধরার ট্রলারকে আটক করে দেশটির উপকূল রক্ষীবাহিনী। অনিচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করা এই ট্রলারের ১৩ জন বাংলাদেশি জেলেকেও আটক করে তারা। পরবর্তী সময়ে তাদের ফ্রেজারগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং অভিযুক্ত হিসেবে মামলা করা হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত হয়। পৃথক আরেকটি ঘটনায় বাংলাদেশের বরিশালের ভোলার ১৩ নং দক্ষিণ দীঘালদি ইউনিয়ন থেকে ১৯ জন জেলেকে বহনকারী অপর একটি মাছ ধরার ট্রলার একই কারণে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করে।
ভারতীয় পুলিশ এই জেলেদেরও গ্রেপ্তার করে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টের ২১ ধারার অধীনে এই ১৯ জেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সব মিলিয়ে ৩২ জন জেলে ভারতের কারাগারে বন্দি রয়েছে।
এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দরিদ্র । জন্মগতভাবে তারা নিম্নবর্ণের। কঠোর পরিশ্রম করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ায় জীবন-জীবিকা অর্জন করেন। এরা কোনোভাবেই অপরাধী নন। পরিস্থিতির কারণে তারা ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করে। এসব জেলে বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় কারাবাস করছেন, তাদের সহায়তার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।
এই মৎস্যজীবীদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ জুলাই ভারতীয় মাছ ধরার জাহাজ এফবি জহর এবং এফবি মঙ্গলচণ্ডি। এই দুটি ট্রলার প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ভেসে যায়। তাতে ৩৪ জন ভারতীয় জেলে ছিল। এসব ভারতীয় জেলে বর্তমানে বাংলাদেশে ফৌজদারি অভিযোগে কারাবন্দি।
১৫ জুলাই মামলা নম্বর ২১-এ মংলা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে এবং বাগেরহাট আদালতে তাদের বিচার করা হয়। এখন তারা সবাই বাংলাদেশের কারাগারে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় সরকার এবং তাদের নিজ নিজ হাইকমিশনের কাছে বার বার আবেদন করা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার শিকার এই নিরীহ জেলেদের দুর্দশার বিষয়টি উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। সপ্তাহ পরেই দুই দেশে রয়েছে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় শারদীয় উৎসব। প্রশ্ন উঠছে দুই দেশ কি এসব জেলেকে শারদীয় উৎসবের আগেই নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে?
দুই দেশে বন্দি এসব জেলের মুক্তির আবেদন জানিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। নয়াদিল্লিতে চিঠি পাঠিয়ে দু’দেশে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে শারদীয় উৎসবের আগে যাতে তাদের ফেরত পাঠানো যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছে। ‘মাসুম’-এর সম্পাদক কিরীটি রায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন জানিয়ে লিখেছেন ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে ৩২ জন বাংলাদেশি এবং ৩৪ ভারতীয় জেলেকে মুক্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে।
উভয় সরকারকে ২০১৫ সালের সমঝোতা স্মারকের অধীনে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনার জন্য একটি মানবিক সহায়তা প্রক্রিয়া প্রটোকল তৈরি করতে হবে। মাসুমের আরো দাবি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া উচিত যে তারা যেন এ ধরনের অসাবধানতাবশত সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে না দেখে সহানুভূতির সঙ্গে আচরণ করে।