সকালটা শুরু হয়েছিল অন্যসব দিনের মতোই। কেউ বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ প্রিয়জনের কাছে, কেউবা ভ্রমণ শেষে নতুন স্মৃতি নিয়ে ফিরছিলেন। কিন্তু সিলেটের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় কয়েক সেকেন্ডের ভয়াবহ এক বাস সংঘর্ষ মুহূর্তে কেড়ে নিল অন্তত ৯টি প্রাণ। সেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হলো কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় বাউলশিল্পী পেহেলি ভৈরবী। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু পরিবারে নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে সিলেটসহ দেশের বাউল অঙ্গনে। এ ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই বাউলশিল্পী পেহেলি ভৈরবীসহ আটজন নিহত হন। পরে আহতদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ জনে।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা বৈরাগীবাজারে ছাবাল শাহ মাজারে বাউল গানের অনুষ্ঠান শেষে ইউনিক পরিবহনের বাসে করে ভৈরবে ফিরছিলেন পেহেলি ভৈরবী। কিন্তু সেই ফেরাই আর শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছায়নি, মহাসড়কেই থেমে গেল তার জীবনের শেষ যাত্রা। মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি সবাইকে ওই বাউল গানের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেটিই হয়ে রইল তাঁর জীবনের শেষ পোস্ট, শেষ আহ্বান এবং শেষ মঞ্চ।
একই দুর্ঘটনায় সিলেট মাজার ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার পাঁচ বন্ধুর একজন সাইফুল ইসলাম (৫৫) নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তাঁর দুই সঙ্গী ফারুকুল ইসলাম ও আব্দুল লতিফ। গত বুধবার সাইফুল, ফারুকুল, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আব্দুল লতিফ—এই পাঁচ বন্ধু সিলেট ভ্রমণে এসেছিলেন। ফেরার পথে সাইফুল, ফারুকুল ও লতিফ বাসে কুলিয়ারচরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। অপর দুই বন্ধু জমরুত মিয়া ও রানা বাসের বদলে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু বাসযাত্রাই পরিণত হয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।
নিহত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২) এবং ঢাকার বিক্রমপুরের জাহাঙ্গীর শেখের তিন বছর বয়সী শিশুকন্যা জাইফা। নিহত ও আহত সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন। নিহত অন্য যাত্রীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে পেহেলি ভৈরবীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ঢল নামে। সহশিল্পী, ভক্ত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা স্মৃতিচারণ করে লিখছেন, গতকালও যার কণ্ঠে বেজেছিল জীবনের গান, আজ তিনি নিজেই চিরনিদ্রায়। একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, নিভিয়ে দিয়েছে এক উদীয়মান শিল্পী, এক শিশুসহ অন্তত ৯ জনের প্রাণ এবং রেখে গেছে স্বজনদের বুকভরা কান্না ও অপূরণীয় শূন্যতা।
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মোস্তফা বলেন, আজকের এই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। একসঙ্গে এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেই আমরা উদ্ধারকাজ শুরু করি এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

