আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার

ফ্লো-মিটার প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম

মুহাম্মদ আজাদ, চট্টগ্রাম

ফ্লো-মিটার প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম

দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। এখানে চার বছর আগে ফ্লো-মিটার স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে কাজ। ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো পরামর্শক। এসবের মাধ্যমে লুটে নেওয়া হয়েছে বিপুল অর্থ।

এত অনিয়মের পর এখন প্রতিষ্ঠানটির অনভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা টিমের সদস্যদের সবুজ সংকেতে প্রকল্প সম্পন্ন করার আয়োজন চলছে। সম্প্রতি এ প্রকল্প অনিয়মের অনুসন্ধান করতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, এ প্রকল্প থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান, ইআরএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান ও প্রকল্পের পরিচালক উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম নঈম উল্লাহ।

দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইআরএলে ফ্লো-মিটার স্থাপন প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদক চট্টগ্রাম-১-এর এক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অভিযোগের সত্যতা পেলে পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যে কারণে ফ্লো-মিটার স্থাপন

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ইআরএলে উৎপন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ, রপ্তানি, আমদানি তেল ও গ্যাস কনডেনসেট গ্রহণ ও সঠিকভাবে পরিমাপ করা। আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ট্যাংক ফার্ম অপারেশন ও সেফটি উন্নত করাসহ সিস্টেম লস কমানো। পরিচালনার সময় ও অপারেটিং পদ্ধতির ব্যয় কমানোর মাধ্যমে মোট ব্যয় সাশ্রয় ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। এ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৮৪ কোটি ৫২ লাখ। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ১৭ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল। পরে এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।

২০২০ সালে প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ইআরএলের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামিল আল মামুনকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে প্রকৌশলী লোকমানকে ইআরএলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়োগের আগেই তিনি এই প্রকল্প নিয়ে কলকাঠি নাড়া শুরু করেন। ষড়যন্ত্র করে সরিয়ে দেন প্রকল্প পরিচালককে।

অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ হাতছাড়া

ইআরএলে আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিশোধনের পর তা সরবরাহ করার সময় প্রতিষ্ঠানটির অপারেটর দিয়ে ষাটের দশকে প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে তেল পরিমাপ করা হয়। এই পদ্ধতির চেয়ে আধুনিক পদ্ধতির ফ্লো-মিটার স্থাপন করে তেলের সঠিক পরিমাপ নির্ণয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর করলে এই কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অতিরিক্ত শ্রম কমানো যেত। বিপিসির সূত্র মতে, ২০১৪-২০১৫, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের হিসাব অনুসারে তেল বিপণন করার সময়ে অধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হতো অন্তত ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

প্রকল্পে যত অনিয়ম

প্রকল্পে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া কর্মসম্পাদনের ক্ষেত্রে মানা হয়নি নিয়ম-কানুন। কাজ দেওয়া হয়েছে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে। উন্নত যন্ত্রাংশের বদলে কেনা হয়েছে নিম্নমানের পণ্য।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পে পরামর্শক বাবদ বরাদ্দ ছিল সাত কোটি টাকা। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ না দিয়ে পুরো টাকাটাই লোপাট করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া নির্বাহী আদেশে কারখানার গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা (এফএটি) পরিচালনা স্থগিত থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা টেস্টের নামে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মাস্টার মিটার কেনায় অনিয়ম

নিয়ম অনুযায়ী মিটার ‘স্মল ভলিয়ম প্রুভার’ কেনার কথা থাকলেও তার পরিবর্তে ‘কোরিওলিস মাস্টার মিটার’ কেনা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রযোজ্য স্মল ভলিয়ম প্রুভারের বাজারমূল্য অন্তত ৮ কোটি টাকা। সেখানে কোরিওলিস মাস্টার মিটারের বাজারমূল্য মাত্র ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু বিল করা হয়েছে স্মল ভলিয়ম প্রুভারের। এতে লুট করে নেওয়া হয় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সেফটি ইস্যুতে নয়ছয়

১২৭টি অটোমেটিক ভাল্ব ক্রয়ে দরপত্রের চাহিদা মোতাবেক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, তেল সেক্টরে প্রচলিত নেমা ৪/৪ এক্স সার্টিফিকেশন সিস্টেম অনুসরণ করা হয়নি। অপ্রচলিত সিএনইএক্স সার্টিফিকেটধারী মালামাল সরবরাহ ও স্থাপন করার অনুমোদন পাইয়ে দেওয়া হয়। এতে দেশের একমাত্র জাতীয় সম্পদ জ্বালানি নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ট্যাংক ফার্ম সেফটি সিস্টেম হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে জানতে ফ্লো-মিটার প্রকল্পের সাবেক পরিচালক জামিল আল মামুনকে কল করা হয়। তবে তিনি এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (ইনস্পেকশন অ্যান্ড সেফটি) ও প্রকল্প পরিচালক এ কে এম নঈম উল্লাহকে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি। পরবর্তী সময়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসেস) এনামুল হক আমার দেশকে বলেন, ফ্লো-মিটার প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি, কাজ চলছে।

দুদকের অনুসন্ধান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনামুল হক বলেন, আমিও শুনেছি। এই প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান করছে দুদক। এই মুহূর্তে আমি বেশি কিছু বলতে পারব না। এই প্রকল্পের সঙ্গে আমি যুক্ত নই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন