একটি ‘হাই’ বা ইমোজি পাঠাতে এখন সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। মুহূর্তেই পৌঁছে যায় প্রিয়জনের কাছে বার্তা, অনুভূতি। কিন্তু এই দ্রুততার ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে অপেক্ষার রোমাঞ্চ, চিঠির গন্ধ আর কাগজে লেখা অনুভূতির উষ্ণতা। ভালোবাসা, অভিমান কিংবা আনন্দ—সবই বন্দি হয়ে আছে স্ক্রিনের আলোয়। ডিজিটাল যুগের এই বাস্তবতায় রাজশাহীর কয়েকটি ডাকবাক্স আজও দাঁড়িয়ে আছে—নীরবে, অবহেলায়, তবে স্মৃতির ভারে ভরপুর হয়ে।
রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর জিপিওর সামনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি ডাকবাক্স যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের নীরব প্রহরী। হলুদ, নীল আর লাল রঙের বাক্সগুলো আজ আর খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। তবুও তাদের ভেতরে জমে আছে অগণিত জীবনের গল্প—ভালোবাসার চিঠি, প্রবাস থেকে পাঠানো খোঁজখবর, পরীক্ষার ফলের আনন্দ কিংবা কারাগারে থাকা স্বজনের দুঃখভরা কয়েকটি লাইন।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল করিম (৭২) স্মৃতিচারণ করে বলেন, একটা চিঠির জন্য আমরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করতাম। ডাক পিয়ন আসছে শুনলেই বাড়ির সবাই ছুটে যেতাম। আজকের মতো যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। কিন্তু তখন যে আনন্দ ছিল, সেটা এখনকার মোবাইলে নেই।
তিনি আরো বলেন, চিঠি ছিল মানুষের আবেগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহক। হাতে লেখা অক্ষরে মানুষ নিজের মন ঢেলে দিত। একটি চিঠি বারবার পড়া যেত, বুকে আগলে রাখা যেত—যা আজকের ডিজিটাল বার্তায় সম্ভব নয়।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি জুবায়ের হাসান (২২) বলেন, আমরা মেসেজ পাঠাই, সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই পাই। সত্যি বলতে চিঠি কখনোই লেখা হয়নি। তারপরও এসব ডাকবাক্স দেখলে মনে হয়, আমরা হয়তো অনেক কিছু খুব সহজে পেয়েছি, আবার অনেক কিছু হারিয়েছিও। তার মতে, প্রযুক্তি যোগাযোগ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে। অপেক্ষার আনন্দ কিংবা প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস এখন আর তেমন অনুভূত হয় না।
অবসরপ্রাপ্ত ডাকপিয়ন নাদের আলী বলেন, এক সময় এই ডাকবাক্সগুলোর সামনে মানুষ লাইন ধরে দাঁড়াত। প্রেমপত্র, চাকরির দরখাস্ত, দূরের আপনজনের খবর—সব ভরসা ছিল এই লাল বাক্সে। এখন অনেক সময় বাক্স খোলা হয়, কিন্তু ভেতরে চিঠি পাওয়া যায় না। তবু এগুলো শুধু লোহার বাক্স নয়, এগুলো মানুষের আবেগ আর স্মৃতির অংশ।
তিনি আরো যোগ করেন, আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না, একটি চিঠির জন্য মানুষ কত দিন অপেক্ষা করত। সেই অপেক্ষার আনন্দটাই ছিল আলাদা।
পোস্ট মাস্টার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা ডাকসেবার ধরন বদলে দিয়েছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। মোবাইল, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ডাকবাক্সের ব্যবহার কমেছে। তবে তিনি মনে করেন, এর গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সরকারি চিঠিপত্র এখনো ডাকসেবার মাধ্যমেই পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ডাকবাক্সগুলো আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। এগুলো একটি সময়ের সাক্ষী। রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রয়োজনে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে—যোগাযোগ একসময় এমনই ছিল।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ডাকবাক্স কেবল যোগাযোগেরমাধ্যম নয়, বরং একটি সামাজিক সংস্কৃতির প্রতীক। মানুষের সম্পর্ক তখন সময় নিয়ে গড়ে উঠত, অনুভূতির গভীরতা ছিল বেশি। প্রযুক্তি আমাদের দিয়েছে গতি, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে কেড়ে নিয়েছে আবেগের স্থায়িত্ব।
আজ ডাকবাক্সগুলো হয়তো অবহেলায় পড়ে আছে—তালাবদ্ধ, রঙ খসে পড়া। তবুও তারা হারিয়ে যায়নি। তারা দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে, মনে করিয়ে দিতে—অনুভূতির আসল মূল্য কখনোই নেটওয়ার্ক স্পিডে মাপা যায় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৩ ডিগ্রি
সাত কোটি টাকায় নির্মিত লেক ভরাট করে নির্মিত হচ্ছে গ্যারেজ