ডিমের খোসা হতে পারে পোলট্রি-শিল্পের মূল্যবান সম্পদ। এটি প্রাকৃতিকভাবেই ক্যালসিয়ামের বড় উৎস। ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, জিংক, সালফার, কপার ও প্রোটিন প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য খুবই জরুরি উপাদান। পোলট্রি, মাছ, গবাদি পশুর খাদ্য এবং জমিতে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণের জন্য এই পাউডার কার্যকর ভূমিকা রাখে। স্থানীয় একটি হ্যাচারিতে দিনমজুরের কাজ করতেন জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভেটি গ্রামের বেলাল মোল্লা। হ্যাচারি থেকে ডিমের খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়ার কাজ করতেন তিনি। স্থানীয় এক এনজিও কর্মকর্তার কাছে জানতে পারেন ডিমের খোসা থেকে মূল্যবান পাউডার তৈরি করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে এটির চাহিদাও রয়েছে। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সেখান থেকেই। ২০২৪ সালে সেই সংস্থা থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে তাদের পরামর্শেই ছোট একটি ডাইস মেশিন কিনেন। তৈরি করেন ক্ষুদ্র কারখানা। শুরু করেন পরিত্যক্ত পচা ডিম ও ডিমের খোসা সংগ্রহের কাজ। তারপর প্রক্রিয়াজাতকরণ। নিজে সংগ্রহ করে শুকিয়ে নিজেই ডাইস মেশিনে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে পাউডার তৈরি করতে থাকেন। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দিনমজুর হিসেবে দুই-চারজন লোক কাজে লাগান। এখন তার ফ্যাক্টরিতে ১২ জন লোক কাজ করেন। প্রত্যেকেই এখান থেকে আয় করে সংসার চালাচ্ছেন।
সম্প্রতি যোগ হয়েছে আরো একটি মেশিন। ভাড়ায় নিয়েছেন আরো দুটি। চলছে চারটি মেশিনে উৎপাদন। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার আরো একটি মেশিন কেনার প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে পরিত্যক্ত ও বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া ডিমের খোসা সংগ্রহ করছেন। রাতে শহরের রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন বেকারি ফ্যাক্টরি থেকে ফেলে দেওয়া খোসা সংগ্রহ করছেন। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে খোসা সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ। বেলাল মোল্লার অনুকরণে আরো দুই-একজন উদ্যোক্তা প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। জেলা প্রাণিসম্পদ ও কৃষি বিভাগ এবং স্থানীয় জাকস ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা তাকে সাহায্য করেন বলে বেলাল জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মনজু আলম সরকার আমার দেশকে বলেন, এই পাউডার মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে জৈব সার হিসেবে গাছের পুষ্টি জোগায়। ক্যালসিয়ামের জোগান দেয়। মাটির অম্লতা কমায়। খনিজ সরবরাহ করে। গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ডিমের খোসায় প্রাকৃতিকভাবে কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা ফসলের পোকা দমনে বেশ উপকারী। অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) কামরুল হাসান জানান, উদ্যোক্তা বেলাল মোল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
জয়পুরহাট সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জানান, জয়পুরহাট জেলা একটি পোলট্রি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায়, এখানকার হ্যাচারিগুলো থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ডিমের খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো। বর্তমানে এই ফেলে দেওয়া খোসা সংগ্রহ করে মেশিনে গুঁড়া করার মাধ্যমে পোলট্রি বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
এই সফল উদ্যোগটির মূল কারিগর জয়পুরহাটের ভেটি গ্রামের উদ্যোক্তা বেলাল উদ্দীন মোল্লা। ফ্যাক্টরির আয় থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালাচ্ছেন। দুই ছেলে, এক মেয়ে সবাইকে স্কুল, মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। বেলালের লক্ষ্য পোলট্রিশিল্পকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

