অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর চলনবিল, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর চলনবিল, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

শীতের আগমনে সিরাজগঞ্জের চলনবিল অঞ্চলে বাড়ছে দেশি ও পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। বিলের জলাশয়, ধানক্ষেত ও গাছপালায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। এবার পাখি রক্ষায় এগিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে পাখি শিকারিরাও তৎপর হয়ে উঠেছেন। তারা পাখি ধরতে বিভিন্ন স্থানে ফাঁদ পেতে রাখছেন। তাড়াশের উলিপুর গ্রামে পাখির নিরাপদ আবাস গড়ে উঠলেও চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় শিকারিদের দৌরাত্ম্যে পাখির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় নিয়মিত নজরদারি, স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ ও শিকার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

শীতকালে জলাশয় ও বিল এলাকায় পাখির আনাগোনা বাড়ে। বিশেষ করে জলাভূমিতে শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। চলনবিলে শামুকখোল, ডাহুক, ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, লালশিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। তবে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্য সংকট ও শিকারের কারণে এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেশে ৭১১ প্রজাতির পাখির উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, পাখির আন্তর্জাতিক তালিকা প্রস্তুতকারী সংস্থা বার্ডস কানাডার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরনধংবের তালিকায় বাংলাদেশের ৮৩৫ প্রজাতির পাখির তথ্য রয়েছে। তালিকা ও শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে এ সংখ্যায় ভিন্নতা দেখা যায়। শীতসহ বছরের বিভিন্ন সময়ে এসব পাখি বাংলাদেশে আসে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য জলাভূমি, ঝোপঝাড় ও গাছপালা সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, শীতের আগমনে তাড়াশ পৌরসভার ঐতিহাসিক হাট উলিপুর গ্রামের শত শত গাছে শামুকখোল, পানকৌড়ি, বক, সারসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাসা বেঁধেছে। সকালে খাবারের সন্ধানে আশপাশের জলাশয় ও ফসলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে এসব পাখি। দিনের শেষে ফিরে আসে গাছের বাসায়। পাখির বিষ্ঠায় বাড়িঘর নোংরা হওয়া এবং দৈনন্দিন কাজে কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামবাসী তাদের তাড়িয়ে দেন না। বরং পাখির নিরাপত্তায় নিজেরাই পাহারা দেন।

উলিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, প্রথম দিকে কয়েকটি পাখি এসে বাসা বাঁধলে গ্রামবাসী নিজেরাই পাহারা দেওয়া শুরু করেন। পাখি শিকার করতে আসা কয়েকজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাখির বিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ পাখিগুলোকে ভালোবাসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তবে চলনবিলের সব এলাকায় পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কয়েক দিন আগে তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়িপাড়া মৌজার একটি ধানক্ষেতে পাখি শিকারের ফাঁদ দেখা যায়।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ-নাটোর সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত পাখি শিকারের ঘটনা ঘটে। তাড়াশের বারুহাঁসসহ চলনবিলের দুর্গম এলাকাগুলোতে শিকারিরা ‘কেল্লা ফাঁদ’ ব্যবহার করেন। এসব এলাকায় যাতায়াত কঠিন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে পাখির মোট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। চলনবিলে দেশি পাখির পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখি আসে। তবে নিরাপদ আবাসস্থল না থাকলে পাখির বিচরণ ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, জনসংখ্যার চাপ, গাছ কাটা, পাখি শিকার ও খাদ্য সংকটের কারণে পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। চলনবিলের জলাভূমি ও শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। পাখি রক্ষায় গাছ ও জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি শিকার বন্ধ করা জরুরি।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, শীতকালে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আসে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে উলিপুর গ্রাম পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পাখির নিরাপত্তায় পাহারাদার নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন