আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঝিনাইদহে সার সংকট তৈরির পাঁয়তারা আওয়ামীপন্থিদের

আরিফুল আবেদীন টিটো, ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহে সার সংকট তৈরির পাঁয়তারা আওয়ামীপন্থিদের

কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ঝিনাইদহে সার কেলেংকারি ঘটানোর পাঁয়তারা চলছে। এর পেছনে রয়েছেন ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীর। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে জাহাঙ্গীরকে জেলাব্যাপী সার সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি যে কোনো সময় সারের কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে কৃষকের মাঝে অস্থিতরতা তৈরি করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চলতি আমন মৌসুমে টার্গেট করে এগোচ্ছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রটি। ধান চাষের মৌসুমটিতে অবৈধ মজুতদারির মাধ্যমে তারা জেলায় সার কেলেংকারি ঘটিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি মাসের প্রথম দিকে ঝিনাইদহের সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এই প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলায় সার পর্যাপ্ত পরিমাণ রয়েছে। অথচ কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় চাহিদা অনুযায়ী সার দিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে সার কেলেংকারি ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ ২৫ বছর একটানা বিএফএর ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা বিতর্কিত হাজী জাহাঙ্গীর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পরও তিনি দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে সার ব্যবসা করে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি পোড়াহাটি ইউনিয়নের সার ডিলার ও বিএফএর ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে গুদামে অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ করেছেন সাকিব হোসেন। তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। এ নিয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সাকিব।

অভিযোগে সাকিবের দাবি, ‘হাজী জাহাঙ্গীরের কাছে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তিনি সেগুলো গোপনে গুদামে মজুত করেছেন। অথচ কৃষকরা ডিলারের কাছে দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জাহাঙ্গীর কালোবাজারে উচ্চমূল্যে ওই সার বিক্রি করছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

এলাকার সাধারণ কৃষকের অভিযোগ, জাহাঙ্গীরের সার গুদামে বরাদ্দের অতিরিক্ত সার মজুত থাকলেও তিনি স্থানীয় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার দিচ্ছেন না। এতে কৃষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এদিকে কালীগঞ্জের সার ডিলার দাউদ হোসেন জানান, বিএফএর ঝিনাইদহ জেলা শাখার জমি কেনার জন্য ২০১৪ সালে ৩২ লাখ টাকা উঠিয়ে সংগঠনের সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীরের কাছে দেওয়া হয়। কিন্তু জমি না কিনে তিনি সেই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। একই অভিযোগ করেন সদর উপজেলার নগরবাথান এলাকার সার ডিলার আব্দুল হান্নান।

কোটচাঁদপুরের সার ডিলার নাছির উদ্দীন বলেন, জাহাঙ্গীর সার ডিলার সমিতিকে ২৫ বছর ধরে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। তিনি নিজেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও নিজেই ক্যাশিয়ার। কে কোন পদে আছেন, তা কাউকে জানতে দেওয়া হয় না। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের হাত করে চলেন বলেও অভিযোগ ডিলারদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএফএর ঝিনাইদহ জেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর ভারতে নিহত আনোয়ারুল আজিম আনার এমপির সহযোগী ছিলেন। আনারের প্রভাব খাটিয়ে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের আমলে তিনি নিজে ও স্ত্রীর নামে সার ব্যবসার একাধিক ডিলারশিপ নিয়েছেন। নীতিমালা ভঙ্গ করে এমপি আনারের নামেও বেশ কয়েকটি লাইসেন্স করে দিয়েছেন।

অভিযোগ আছে, জাহাঙ্গীর ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর প্রভাব খাটিয়ে গান্না ইউনিয়নের ডিলার মিলন ঘোষের লাইসেন্স বাতিল করিয়েছেন। একইসঙ্গে মিলনের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে লাইসেন্স বাতিল করে ক্ষমতাসীনরা। পরে উচ্চ আদালতে রিট করে বিএনপি সমর্থক মিলন ঘোষ লাইসেন্স ফিরে পান।

কৃষকদের অভিযোগ, স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর ঝিনাইদহে ফ্যাসিবাদের দোসররা সার অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির পাশাপাশি সার কেলেংকারি ঘটানোর পাঁয়তারা করছে। এসব বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের ঝিনাইদহ জেলা শাখার সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

এদিকে অভিযোগপত্র প্রাপ্তির বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসার নূর এ নবী জানান, সাকিব নামের এক যুবক তার কাছে অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগটির ব্যাপারে তদন্ত চলমান।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ষষ্টি চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, সারের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে সোচ্চার কৃষি বিভাগ। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন