টাকার বস্তাসহ আটক গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম সাঘাটা উপজেলায় ছিলেন প্রায় ১৬ বছর। দাপটের সঙ্গে কাটিয়েছেন পুরো সময়। উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
সে সময় সাবেক ডেপুটি স্পিকার প্রয়াত অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার পোষ্যপুত্র ছিলেন তিনি। তার আশীর্বাদে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে নয়ছয় করে কামিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। গ্রামের বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর রাজাপাড়ার ভাটাপাড়ায় গড়েছেন প্রাসাদসম বাড়ি।
সাবেক ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বির আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই প্রকৌশলী ছাবিউল বনে যান কোটি কোটি টাকার মালিক। ডেপুটি স্পিকারের মৃত্যুর পর ওই এলাকার সাবেক এমপি মাহমুদ হাসান রিপনের আশীর্বাদে থেকেছেন।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকতেন। তার ক্ষমতা আর দাপটে তটস্থ থাকতেন ঠিকাদাররা। গত শুক্রবার ৩৭ লাখ টাকাসহ প্রকৌশলী ছাবিউলের আটকের খবর সাঘাটা উপজেলার ঠিকাদার, ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়দের মাঝে আলোচনার একমাত্র বিষয় ছিল। অনেককে আনন্দ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে হতাশও হয়েছেন অনেকে। কারণ শনিবার জানা যায়, প্রকৌশলী ছাবিউলকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালের ২১ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সাঘাটায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন ছাবিউল। যোগদানের পর কিছুদিনের জন্য লোক দেখানো বদলির পর আবারও ২০০৭ সালের ১৯ জানুয়ারি তাকে সাঘাটায় বদলি করে আনেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার প্রয়াত ফজলে রাব্বি মিয়া। তখনই ডেপুটি স্পিকারের পোষ্যপুত্র হিসেবে তার নাম চাউর হয়।
এরপর ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা ১৪ বছর সাঘাটায় একই কর্মস্থলে থেকেছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে এতদিন একই কর্মস্থলে থাকায় এলাকায় একটি বাহিনী তৈরি করে দাপটের সঙ্গে চলেছেন তিনি। আইনের কোনো তোয়াক্কাই করেননি। প্রকাশ্যে এলাকার অপরাধীদের গাড়িতে নিয়ে চলাফেরা করতেন। ডেপুটি স্পিকার রাব্বির ছোট ভাই অধ্যক্ষ ফরহাদ রাব্বি ও তার লোকজনের সঙ্গে দিনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন।
ফরহাদ রাব্বি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই যা ইচ্ছা তাই করেছেন। ডেপুটি স্পিকার ঢাকা থেকে বাড়ি এলেই প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম তার বাড়ি গিয়ে সারা দিন ঘুরঘুর করতেন। সাঘাটায় তার ১৫ বছর সময়কালে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি হলেও কেউ কিছু বলার সাহস পাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার এই প্রতিনিধিকে জানান, দীর্ঘদিন এই উপজেলায় থেকে তিনি যত টাকা কামিয়েছেন, তার পরিমাণ হিসাব করা যাবে না। তাকে টাকা না দিলে কোনো বিলে স্বাক্ষর করতেন না বলেও জানান তারা।
অফিসের কর্মচারীদেরও নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি-ধমকি দিতেন। শারীরিকভাবে নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। টাকা চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অফিসের কর্মচারী স্থানীয় মশিউর রহমানকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেন। ভয়াবহ নির্যাতনের পর জোরপূর্বক চাকরিচ্যুতও করা হয় তাকে। এসব অপকর্মে প্রকৌশলী ছাবিউলের সঙ্গে ছিল স্থানীয় বাহিনী। তাদের মাসিক বেতনে লালন-পালন করতেন তিনি।
বোনারপাড়ার বাসিন্দা নির্যাতিত মশিউর রহমান বলেন, আমার ওপর অমানবিক আচরণ করেছেন ছাবিউল। অপরাধ না করলেও আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রাইভেটকার নিয়ে নিজ এলাকায় যাচ্ছিলেন বর্তমানে গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম। গাড়িতে প্রায় ৩৭ লাখ টাকাসহ সিংড়া থানা পুলিশ তাকে আটক করে।
শুক্রবার দুপুরে তাকে নাটোর আদালতে তোলা হয়। পরে এ বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করবেন মর্মে মুচলেকা নিয়ে তাকে স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রকৌশলী ছাবিউল বেশি যাতায়াত করতেন রাজশাহী, যেখানে তার গ্রামের বাড়ি। এছাড়া রাজধানী ঢাকায়ও তার বেশি যাতায়াত ছিল। ঢাকায় কে থাকেন বা কোথায় কার কাছে তিনি যান, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অবৈধ পন্থায় কামানো সব টাকা দিয়ে তিনি ঢাকায় বাড়ি, গাড়ি ও ফ্ল্যাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদককে জানানো হয়েছে বলে জানান সিংড়া থানার ওসি আসমাউল হক। গতকাল দুপুরে এ বিষয়ে জানতে ছাবিউল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

