ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে জমি দখল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন নয় আওয়ামী লীগের অপসারিত হুইপ ও কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের বিরুদ্ধে। ‘কক্সবাজার ক্রীড়া ও কারিগরী কলেজ’ তেমনই একটি ভুয়া প্রকল্প। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রামু এলাকার জোয়ারিয়ানালায় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জমি দখলে নিলেও বাস্তবে ওই জমিতে ক্রীড়া কলেজের কোনো নিশানাও দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, জমি দখলের জন্যই শত শত মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে ওই জমিতে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিলেন কমল।
সূত্র মতে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রভাব খাটিয়ে মহাসড়কের পাশে রামুর ধলিরছড়া মৌজার প্রায় ৩০ একরের অধিক জায়গাটি দখলে নেন সাবেক এমপি কমল। দখল করা জায়গায় ক্রীড়া ও কারিগরি কলেজের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখল পাকাপোক্ত করেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, দখল করা বিশাল জায়গার একপাশে চার কক্ষবিশিষ্ট টিনশেডের একটি ভবন রয়েছে। যেটি সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত সরকারি বরাদ্দ দিয়ে নির্মিত। এ ছাড়া জায়গার চারপাশে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে সরকারি সোলার লাইট। নির্মিত আধাপাকা ভবনটির একটি কক্ষে আদর্শগ্রাম এলাকার এনামুল নামে এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। দখলে রাখা জায়গা দেখভালের জন্য হুইপ কমল তাদের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেই এনামুল।
জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহমদ প্রিন্স বলেন, সাবেক এমপি ও হুইপ কমল ক্রীড়া ও কারিগরি কলেজের নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড টাঙিয়ে মূল্যবান সরকারি জায়গা দখল করার ১৫ বছরেও এখানে কোনো কলেজের অস্তিত্ব গড়ে উঠেনি। এই কলেজের নাম ব্যবহার করে তিনি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ লুটপাট করেছেন।
রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাশেদুল ইসলাম বলেন, ক্রীড়া ও কারিগরি কলেজ প্রতিষ্ঠার নামে সাবেক সংসদ সদস্য কমল সরকারি জায়গাটি অবৈধভাবে দখল করেছিলেন। সম্প্রতি জায়গাটি উদ্ধার করে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেদখলে থাকা জমিতে এরই মধ্যে যেসব অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তার সবটাই উচ্ছেদ করা হবে। দখলদারদের তালিকা তৈরি করে মামলাও করা হবে।
এদিকে একই কায়দায় রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের পাইন্যাশিয়া ঘোনা এলাকায় একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে সাবেক এমপি কমল সাইনবোর্ড দেখিয়ে ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন সরকারের এমপি হওয়ার সুবাদে কমলের দখলযজ্ঞ ও নানা অসংগতির বিরুদ্ধে প্রশাসন ও এলাকায় মানুষ প্রতিবাদ করতেও সাহস করেনি এতদিন।
এ ছাড়া রামুতে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে রামু বাইপাস চত্বরে যেখানে একসময় পথচারীরা নামাজ আদায় করতেন, সেখানে একটি ফুটবল ভাস্কর্য তৈরি করেছেন সাবেক এমপি কমল। রামুর চৌমুহনীতে করেছেন কলম ভাস্কর্য, যার কারণে সেখানে যানজট লেগেই থাকে। রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আগে আরেকটি ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ চলমান ছিল, যা এখন বন্ধ।
এ বিষয়ে রামু প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমির হোসেন হেলালী বলেন, এগুলো কোনো জনবান্ধব প্রকল্প নয়, মূলত সরকারি টাকা আত্মসাতের জন্য ভুয়া প্রকল্প। রামু হাসপাতাল গেটের আগে ক্রসিংয়ে ভাস্কর্য নির্মাণের কারণে বিপরীতমুখী গাড়ি দেখা না যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছেন অনেক পথচারী। এটি অপসারণ করা সময়ের দাবি।
সূত্র মতে, এসব অনিয়মে মূল সহযোগী ছিলেন সাবেক হুইপের ক্যাশিয়ারখ্যাত রামু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনজুর রহমান। এই পিআইও লুটপাটের টাকা দিয়ে কমলের বাড়ির পাশে কয়েক কোটি টাকার জমি নিয়ে করেছেন তিনতলার অট্টালিকা।
দুর্নীতির এই বরপুত্র এখন অবসরজনিত ছুটিতে (এলপিআর)। অনেকেই মনে করেন, পিআইও মনজুর রহমানকে আইনের আওতায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এ নিয়ে জানতে সাবেক হুইপ ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ রয়েছে। সূত্র মতে, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের সময় তিনি রামু সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। পরে ওখান থেকে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

