দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনেক বিদ্যালয় থেকে এবার কেউ পাস করতে পারেনি। এমন ফলাফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা অবিলম্বে শতভাগ ফেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান।
পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেন আটজন। এমন ফলাফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখা থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অর্থাৎ বিদ্যালয়টির পাসের হার শূন্য শতাংশ। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র পাঁচজন পরীক্ষার্থী এসএসসিতে অংশ নিলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন আটজন। এত কমসংখ্যক পরীক্ষার্থী নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করায় বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানটি ভিজিট করা হবে এবং ফলাফল এমন হওয়ায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শোকজ করা হবে।
পত্নীতলা (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর পত্নীতলায় চকনোদবাটি ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেননি। এবার এ মাদরাসা থেকে ১৯ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। ফলাফলের তথ্যটি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শেখ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন নিশ্চিত করেছেন।
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় ১৮টি বিদ্যালয় থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। এ ব্যাপারে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ও স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শতভাগ ফেল করা বিদ্যালয়গুলো হলো রংপুরের পীরগঞ্জের কুমারপুর ও ঘাসিপুর হাইস্কুল, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের কাজীপাড়া ও পলাশবাড়ীর মনোহরপুর গার্লস স্কুল, নীলফামারীর ডোমার আমবাড়ী বহুমুখী গার্লস স্কুল, কুড়িগ্রামের রাজারহাটের তালতলা হাইস্কুল, মাধবপুর গার্লস স্কুল, তাজবাড়িগঞ্জ হাই স্কুল।
পঞ্চগড়ের বোদার বলরামহাট গার্লস স্কুল ও সরদারপাড়া গার্লস হাই স্কুল, কুড়িগ্রামের পূর্ব কোমরপুর হাইস্কুল, ব্রাহ্মণপাড়া হাইস্কুল, পাথরডুবি আদর্শ হাই স্কুল, লালমনিরহাটের কালিগঞ্জের এ,এন রথবাড়ী গার্লস হাই স্কুল।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চারটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এবং একটি হরিপুর উপজেলার। বিদ্যালয়গুলো হলো আকচা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, অনভারডিঘি উচ্চবিদ্যালয়, মাধবপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, তাওরিগাঁ উচ্চবিদ্যালয়, রামপুর ভাতুরিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। পাঁচ বিদ্যালয়ের মোট ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় একজনও পাস করেনি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউসুফ আলী জানান, তার বিদ্যালয় থেকে ২০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল। উপজেলা মাধ্যমিক এলাকাবাসী জানান, ওই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার মান খুবই খারাপ। শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসেনও না, পাঠদানও করান না।
বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় দুটি দাখিল মাদরাসায় শতভাগ ফেল করেছে। বিলাশবাড়ী ইউনিয়নের জোলাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার তিনজন এবং মথুরাপুর ইউনিয়নের গোবরচাপাহাট আখতার হামিদ সিদ্দিকী দাখিল মাদরাসার একজন পরীক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই ফেল করেছে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম বলেন, প্রতিষ্ঠান দুটি এমপিওভুক্ত নয়।
ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এবারের দাখিল পরীক্ষায় উপজেলার মাগুড়া দাখিল মাদরাসা থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। পরীক্ষায় মাদরাসাটি থেকে ১৯ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে সবাই অকৃতকার্য হয়। এছাড়া উপজেলার লতিফা-আয়শা দাখিল মাদরাসা থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজন কৃতকার্য হয়।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুজ্জামান আমার দেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৭৬ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার মান নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিন দিন কমছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানে শিক্ষকদের কোনো আগ্রহ নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসা সুপার মো. জাকির হোসেন বলেন, রেজাল্ট খারাপ। আমরা ভালো নেই। গ্রাম এলাকার প্রতিষ্ঠান ছেলেমেয়েরা পড়তে যায় না।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেনি কেউই। উপজেলার ভারড়া ইউনিয়নের আগদিঘুলিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেনি।
এছাড়া সলিমাবাদ ইউনিয়নের আনোয়ার খান মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হতে পারেনি কেউই।
উপজেলার ৫৯টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ৩,৩৯১ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। এদের মধ্যে মোট কৃতকার্য হয়েছে ১,৮৫০ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ১,৩৪১ জন শিক্ষার্থী।
উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাসের হার শতকরা ৬১.৬৫ ভাগ, মাদরাসা ৩৯.১৭ ভাগ, ভোকেশনাল ৪৫.৭০ ভাগ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
এ বছর উপজেলায় এ প্লাস পেয়েছে ৬৩ জন। এদের মধ্যে ৫০ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ও ১৩ জন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে।
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয়ের বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নাদির আহাম্মদ বলেন, যে প্রতিষ্ঠান দুটির পাসের হার শূন্য তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ এমন রিপোর্ট ইতিপূর্বে দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে সাতক্ষীরার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক, নৈশ ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় রয়েছে।
শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান হলো আশাশুনি উপজেলার আশাশুনি গোদাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, সাতক্ষীরা সদরের সাতক্ষীরা নৈশ বিদ্যালয় (নাইট স্কুল), দেবহাটা উপজেলার বাবুরাবাদ ঢেবুখালী বিদ্যালয় এবং শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের সাহেবখালী সিদ্দিকগাজী বিদ্যালয়।
আশাশুনি গোদাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জেবুন্নেছা বলেন, এ বছর বিদ্যালয়টি থেকে মানবিক বিভাগে চারজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রকাশিত ফলে তাদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
দেবহাটার বাবুরাবাদ ঢেবুখালী বিদ্যালয়ের চিত্র আরো নাজুক। বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী নূর হোসেন জানান, ২০০১ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনো বেতন-ভাতা পান না। এ কারণে অনেক শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ী সদর উপজেলার জালদিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে সাতজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও একজনও পাস করেনি। সুলতানপুর ইউনিয়নের জালদিয়া গ্রামের এই বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। জুনিয়র হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক (উচ্চবিদ্যালয়) বিদ্যালয়ে উন্নীত করার পর ১৪ বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে। বরাবরের মতো ফলাফল খুব নিম্নগামী থাকলেও এবার সাতজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও ফলাফল শূন্য।
জালদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আমার দেশকে জানান, এমপিওভুক্ত এ বিদ্যালয়টিতে ১০ জন শিক্ষক আছে। তারা সবাই এমপিওভুক্ত।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কাজী এজাজ কায়সার বলেন, জালদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসির ফলাফল খুবই দুঃখজনক। অকৃতকার্যের বিষয়ে সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, সন্দ্বীপের উড়ির চর জুনিয়র হাইস্কুলে এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফলে শতভাগ ফেল করেছে। এই বছর বিদ্যালয়টি থেকে দশজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই দেখেনি পাসের মুখ। অথচ বিগত বছরগুলোতেও স্কুলটিতে পাসের হার ছিল বেশ সন্তোষজনক। মূলত চরম আর্থিক সংকট, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়বিমুখতায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উড়ির চর হাইস্কুল হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ৬০ জন। অথচ নিয়মিত ১০ জন শিক্ষার্থীও ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফি থেকেই মূলত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মেটানো হতো। কিন্তু গত দুই বছর যাবৎ বিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষকের কেউই বেতন পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করতে না পেরে ইতোমধ্যে তিনজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে আসা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। বাকিরা কোনোমতে টিকে থাকলেও পাঠদান কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, এসএসসির আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি পরীক্ষায় এই ১০ জনের সবাই অকৃতকার্য হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা না থাকলেও, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘বিশেষ বিবেচনা’র নামে তাদের সবাইকে বোর্ডের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে এবং পাসের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
এ বিষয়ে উড়ির চর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হাসান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘ দুই বছর ধরে আমরা কোনো বেতন পাচ্ছি না। বলতে গেলে খেয়ে না খেয়ে আমরা শিক্ষকরা স্কুল চালাচ্ছি। ভেবেছিলাম এত কষ্টের পরও প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখলে হয়তো ভালো কিছু হবে, কিন্তু তা হলো না।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইসমত আরা বেগম আমার দেশকে জানান, ‘প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হলেও, যেহেতু পাঠদানের সরকারি অনুমতি রয়েছে, সেখানে শিক্ষকদেরও ফলাফলের প্রতি কিছুটা দায়বদ্ধতা আছে। শতভাগ ফেলের বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


