এক পাশে খুলনা শহর। মাঝে হাজামজা খালে রূপ নেওয়া ময়ূর নদ। ওপাড়ে দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। গল্লামারী ব্রিজ দিয়ে ময়ূর নদ পাড়ি দেওয়া মাত্র হাতের ডানেই রয়েছে ‘লিনিয়ার অ্যামিউজমেন্ট সিটি পার্ক’। এলাকাবাসীর চিত্তবিনোদনের লক্ষ্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) অর্থায়নে নির্মিত হয় পার্কটি।
বাইরে থেকে বিনোদন কেন্দ্র মনে হলেও ভেতরে প্রবেশের পর পাল্টে যাবে ধারণা। চারপাশে জনস্রোত-কর্মকোলাহল, ভেতরে উঁচু টিনের বেড়া আর ঘের দেওয়া ছাউনির আড়ালে প্রেমিক যুগলের দৃষ্টিকটু অবস্থান। কোথাও মাদকের উৎকট দুর্গন্ধ।
সুস্থ পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ায় এখন আর কেউই এখানে আসেন না পরিবার-পরিজন নিয়ে চিত্তবিনোদনের আশায়। শুধুমাত্র কাপল আর নেশাগ্রস্তদের আড্ডাস্থল এখন এই পার্কটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভেতরে থাকা দর্শনার্থীর সবাই জোড়ায় জোড়ায় বসা। কেউবা পার্কের বেঞ্চে, কেউবা গাছের আড়ালে। বেশিরভাগই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তারা ব্যক্তিগত আড্ডায় সময় অতিবাহিত করতে ব্যস্ত থাকে এখানে।
পার্কের মধ্যে কিছুদূর গেলেই পাওয়া যায় গাঁজার গন্ধ। দিনে কিংবা রাতে সব সময় চলে মাদক সেবন। গাছের আড়াল বা একটু দূরে বসেই আড্ডায় মেতে ওঠে মাদকসেবীরা। পার্কটি খুলনা মহানগরীর শেষ প্রান্তে হওয়ায় অভিভাবকদের নজর এড়ায় সহজেই। যে কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা অবাধ প্রেমের আড্ডাস্থল হিসেবে বেছে নেয় এ পার্কটি।
পাশাপাশি অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত কপোত-কপোতিরাও তাদের মিলনমেলা হিসেবে নিয়েছে এই পার্ককে। অপেক্ষাকৃত কম দর্শনার্থী থাকায় তাদের কোনো সমস্যায়ও পড়তে হয় না।
পার্কে রয়েছে ওয়ান্ডার হুইল, ফ্যামিলি ট্রেন, মিনি ট্রেন, ফ্লাওয়ার কাপ, মেরি গো রাউন্ড, জক রাইড, বাউন্সি ক্যামেলসহ আকর্ষণীয় একাধিক পিকনিক স্পট। এর পাশাপাশি সেমিনার কক্ষ, বিয়ে, জন্মদিন ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।
তবে পিকনিক স্পট ও রাইডগুলোর প্রতি দর্শনার্থীর আগ্রহ না থাকায় বেশিরভাগই অকেজো ও ময়লায় পরিপূর্ণ। এখানে আসা দর্শনার্থীর প্রধান লক্ষ্যই অসামাজিক কার্যকলাপ, অবাধে প্রেম এবং মাদকের আড্ডা ও বেচাকেনা।
কেসিসি সূত্রে জানা যায়, নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য গল্লামারীর ময়ূর নদীর পাড়ে প্রায় ১৪ একর জমির ওপর ২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্কটি নির্মাণ করা হয়। ২০০৯ সালে এ পার্কের নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও কাজ শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। কেসিসি সরাসরি পার্কটি পরিচালনা না করে লিজের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে দিয়েছে।
পার্কের গেটে একটি টি-স্টলের নারী বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করে বললেন, শীতের সিজনে অনেক পিকনিক পার্টি আসে। অনেকে ফ্যামিলি নিয়ে আসেন। সে সময় পরিবেশ কিছুটা ভালো থাকে। বাকি সারা বছর আজেবাজে আড্ডা আর খারাপ কাজ হয়।
তিনি বলেন, ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা চা-নাশতা করতে এখানে আসে। এই রাস্তায় অনেক ফ্যামিলি বাসা আছে। তাদের সবার স্বার্থে এখানকার পরিবেশ ভালো হওয়া দরকার।
পার্কে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৪০ টাকা। এ পার্কে কাপল টিকিটের ব্যবস্থা আছে, যার দাম ৮০ টাকা। অর্থাৎ এক টিকিটে একটি জুটি পার্কে প্রবেশ করতে পারবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের এস্টেট অফিসার গাজী সালাহউদ্দিন বলেন, কেসিসি পার্কটি দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দিয়েছে। পার্কের পরিবেশ ও রাইডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের। কোথাও অনিয়ম হলে তারও প্রতিকার তারা করবে।
সম্প্রতি লিনিয়ার পার্ক সাব-লিজ নিয়েছেন শেখ তৈয়েবুর রহমান। তার দাবি, পার্কের পরিবেশ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঝোপঝাড় কেটে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। বাজে আড্ডা বা নোংরামি বন্ধ করা হয়েছে। তবে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর না থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়ে গেছে। প্রতি রাতেই চুরি হয়। এ কারণে নতুন ইনভেস্ট হচ্ছে না। তিনি বলেন, পার্ক জনগণের জিনিস। এটা জনগণের ব্যবহারের জন্য রাখা উচিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

