মৌলভীবাজারে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও বাজারে কৃষকদের জন্য নেই শুধু হাহাকার। রোপা আমনের ভরা মৌসুমে ধান বাঁচাতে মরিয়া কৃষকরা এখন জিম্মি আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত ডিলার সিন্ডিকেটের হাতে। প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। অথচ ডিলারদের গোদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে সিন্ডিকেট।
সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতিটি বস্তা ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের জন্য অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার নির্ধারিত পরিমাণও মিলছে না। ফলে মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ ও পরিচর্যার কাজে ধান বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতিটি বস্তা ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার নির্ধারিত পরিমাণ সরবরাহও মিলছে না। ফলে মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ ও পরিচর্যার কাজে সমস্যায় পড়ছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে মৌলভীবাজার জেলার ৫৩ জন ডিলারের মধ্যে রয়েছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরের মেসার্স রহমান বীজঘর অ্যান্ড কৃষি মেডিসিন সেন্টার, সরকার বাজার বাস স্ট্যান্ডের মেসার্স রাহী এন্টারপ্রাইজ, নতুন ব্রিজের মেসার্স আলহাজ্ব মাসুক ট্রেডার্স, কাগাবালা বাজারের মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজ, কাজির বাজারের মেসার্স তন্ময় ট্রেডার্স, একাটুনার মেসার্স রুহিদ পোলট্রি ফিড অ্যান্ড তানিম এগ্রো ফার্ম, শিমুলতলা বাজারের মেসার্স সারঘর, দিঘীরপার বাজারের মেসার্স মাহবুবুর রহমান, গোবিন্দপুর রাজারের মেসার্স তাওসিফ ট্রেডার্স, কোদালীপুলের মেসার্স ইমরান অ্যান্ড ব্রাদার্স, গিয়াসনগরের মেসার্স মনু এন্টারপ্রাইজ, সৈয়দ কুদরত উল্ল্যা সড়কের মেসার্স এম এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্ট, শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুরের মেসার্স জলি এন্টারপ্রাইজ, ভূনবীরের মেসার্স ইকো এগ্রিকালচার স্টোর, শ্রীমঙ্গল শহরের মেসার্স জননী এন্টারপ্রাইজ, সিন্দুরখানের মেসার্স মিতালী এন্টারপ্রাইজ, কালাপুরের মেসার্স সায়মা ট্রেডার্স, আশিদ্রোনের মেসার্স মনমোহন ট্রেডার্স, রাজঘাটের মেসার্স জামান ট্রেডার্স, কালিঘাটের মেসার্স উত্তরা ট্রেডার্স, সাতগাঁওয়ের মেসার্স রাহুল ট্রেডার্স, পৌরসভার মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজ, রাজনগরের মুন্সিবাজারের মেসার্স অর্নব এন্টারপ্রাইজ, গোবিন্দ বাটির মেসার্স পি আর এন্টারপ্রাইজ, সদরের মেসার্স ফরাজী এন্টারপ্রাইজ, হরিপাশার মেসার্স আরক অ্যান্ড ব্রাদার্স, তারাপাশার মেসার্স গৌরাঙ্গ অ্যান্ড সন্স, কমলগঞ্জ উপজেলার বাবুবাজারের মেসার্স রাফি এন্টারপ্রাইজ, নয়াবাজারের মেসার্স মুক্তা এন্টারপ্রাইজ, শমসেরনগর বাজারের মেসার্স এম হাসান এন্টারপ্রাইজ, ভানুগাছা বাজারের মেসার্স চৌধুরী ট্রেডার্স, শমসেরনগর বাজারের মেসার্স কৃষি ঘর, আদমপুর বাজারের মেসার্স খান অ্যান্ড সঙ্গ, মেসার্স নাঈম এন্টারপ্রাইজ, ভানুগাছ বাজারের মেসার্স জননী এন্টারপ্রাইজ, মুন্সিবাজারের মেসার্স আকবর হোসেন, কুলাউড়া উপজেলার দক্ষিণ বাজারের মেসার্স ডিলমন স্টোর, চৌমুহনার মেসার্স নেছার এন্টারপ্রাইজ, নবাবগঞ্জ বাজারের মেসার্স খান ট্রেডার্স, বরমচাল বাজার মেসার্স মিন্টু ট্রেডার্স, ব্রাহ্মণ বাজারের মেসার্স কৃষি বিতান, টিলাগাও বাজারের মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজ, রবির বাজারের মেসার্স শাপলা অটো রাইস মিল, পীরের বাজারের মেসার্স তাহির ট্রেডার্স, উত্তর কুলাউড়ার মেসার্স বেলাল ট্রেডার্স, কটারকোণা বাজারের মেসার্স রুহিন ট্রেডার্স, ভাটেরা স্টেশন বাজারের মেসার্স কাদির মিয়া অ্যান্ড সন্স, বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুরের মেসার্স রাজ ট্রেডিং, সুজানগরের মেসার্স জমির ট্রেডার্স, কাঠালতলী বাজারের মেসার্স হাসান ট্রেডার্স, দক্ষিণভাগ বাজারের মেসার্স কৃষি এন্টারপ্রাইজ, বড়লেখা পৌরসভার মেসার্স পকুয়া এন্টারপ্রাইজ, জুড়ী উপজেলার ভবানীগঞ্জ বাজারের মেসার্স মিতালী স্টোর অ্যান্ড বীজঘর।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মৌলভীবাজার জেলায় ৯৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮০ হাজার হেক্টরে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ইউরিয়া ৪ হাজার ২৯৬, টিএসপি ৫ শত ৯০, ডিএপি ১ হাজার ৪১৯, এমওপি ৮ শত ৪০ মেট্রিক টন। এরমধ্যে ডিলাররা উত্তোলন করেছে ইউরিয়া ২ হাজার ৫, টিএসপি ৩শত ৩৮, ডিএপি ৭শত ২০, এমওপি ৪ শত ৭১ মেট্রিক টন। মজুদ আছে ইউরিয়া ১ হাজার ২৬, টিএসপি ১ শত ৭০, ডিএপি ২ শত ১৫, এমওপি ২ শত ৮ মেট্রিক টন সার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুদামে এখনো মজুত আছে বিপুল পরিমাণ সার কিন্তু বাজারে সংকট তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। মৌলভীবাজার জেলার ৫৩ জন ডিলারের সবাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের সাথে যুক্ত। রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদেরকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলার নতুন ব্রিজের মেসার্স আলহাজ্ব মাসুক ট্রেডার্সের মালিক বর্তমান পলাতক আওয়ামী চেয়ারম্যান আপ্পান আলীর আত্মীয়। শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর ইউনিয়নে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির নামেও একাধিক ডিলার রয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারী নেতা, তাদের ভাই, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের নামেই সারের ডিলারশিপ। একই অবস্থা সারাজেলার।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার জগৎপুর গ্ৰামের কয়েছ আহমদ বলেন, আমাদের ধান এখন সার ছাড়া বাঁচানো কঠিন। কিন্তু বাজারে গেলেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের ভিমসি গ্রামের কৃষক মহরম আলী, নাসির, মান্নান, বেলাল ও অজি উল্লাহ ইউরিয়া সার না পাওয়ার অভিযোগ করে বলেন, রোপা আমন রোপন শেষ হয়েছে অনেক আগে কিন্তু এখন টিএসপি সার মিলছেনা কোথাও। ৬ থেকে ৭ মাস ধরে মিলছেনা সার। এমন কী পুরো শ্রীমঙ্গলেই পাওয়া যাচ্ছে না টিএসপি সার। তবে মোটা অংকের টাকা দিলেই কেবল মিলছে সার। এগুলো বস্তা প্রতি ১ হাজার ৮ শত টাকা। এর জন্য ম্যামো চাইতে হেলে ডিলাররা ম্যামো দিচ্ছে না। সার চাইতে গেলে ডিলার বলে সারের বরাদ্দ নেই।
শ্রীমঙ্গলের আশিদ্রোন ইউনিয়নের ভুজপুর বাজারের খুচরা সারের ডিলার আশিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, গত মাসে চাহিদার তুলনায় কম দিলেও এ মাসে এখনো কোন সার পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, গত ৬ থেকে ৭ মাস ধরে মরোক্কর বাংলা টিএসপি পাচ্ছি না। কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে সারগুলে চা-বাগানে বিক্রি করা হয়। তিনি বলেন, সারের যদি সংকট থাকে তাহলে তো সব জায়গায় সংকট থাকার কথা। কিন্তু আমরা সার হবিগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জে চাইলেই পাই তবে টাকা বেশি দিতে হয়। শায়েস্তাগঞ্জে প্রতি বস্তা ডেপ সারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ২০ টাকা হলেও সেখানে তারা বিক্রি করে ১৩শত টাকায়। আর মরক্কোর টিএসপি সার সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৩শ ২০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৮ শত থেকে ২ হাজার টাকায়।
কমলগঞ্জের মুন্সিবাজার ইউনিয়নের হরিস্বরণ গ্রামের কৃষক জোয়াদ মিয়া, সুফিয়ান মিয়া ও রহিমপুর ইউনিয়নের কৃষক মোসাহিদ মিয়া ও ইলিয়াস মিয়া পতনউষার ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের কৃষক আবু হানিফা জানান, বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না, যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটা অতিরিক্ত মূল্যে দিয়ে নিতে হয়। এখানকার সব সারের ডিলার আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে।
রাজনগর সদর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, ডিলাররা বলেছে সারের বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ এলে তারা সার দেবে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের উলুয়াইল গ্রামের কৃষক শেখ ইমাদ উদ্দিন বলেন, কোন সার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। আজ তিনদিন ধরে ডিএপি সার খুঁজছি, ডিলারদের ধরনা দিচ্ছি। কেউই সার দিতে পারছে না। তিনদিন পর অন্য এক মাধ্যমে ২ বস্তা সার পেয়েছি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় সারের ডিলারদের নিয়োগ দেয়া। যার কারণে বাজারে সমস্যা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সংকট হচ্ছে এটি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
এবিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জালাল উদ্দীন বলেন, কোথাও কোথাও সংকট থাকতে পারে, সারের বড় কোন সংকট নেই। জেলার সবগুলো উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে সার মজুত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, আমি একটু খোঁজ নিয়ে দেখি সার কোথায় গেলো। কোন অনিয়ম যদি হয়ে থাকে অবশ্যই সেই ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় সারের ডিলারের নিয়োগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

