বর্ষা এলেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় গ্রামবাংলার শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প। বর্ষার পানিতে নদী-নালা ও বিল-ঝিল ভরে উঠতেই মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সুতারবাড়ি এলাকায় আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে নৌকা তৈরির কারখানাগুলো।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত করাতের শব্দ, হাতুড়ির ঠুকঠাক আর কাঠের গন্ধে মুখর থাকে পুরো এলাকা। বছরের অন্য সময় কাজের চাপ কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমে কিছুটা বাড়তি চাহিদা তৈরি হওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
তবে এই ব্যস্ততার মাঝেও হতাশা পিছু ছাড়ছে না তাদের। নদী-নালা,খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো আর নৌকার প্রয়োজন হয় না। ফলে শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই হস্তশিল্প আজও টিকে থাকার লড়াই করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ,শিবচর উপজেলার সুতারবাড়ির বিভিন্ন বাড়ি ও কর্মশালায় চলছে নৌকা তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। কেউ কাঠ মাপছেন, কেউ করাত দিয়ে কাঠ কেটে আকার দিচ্ছেন, আবার কেউ দক্ষ হাতে পেরেক লাগিয়ে নৌকার কাঠামো তৈরি করছেন। দীর্ঘদিনের
অভিজ্ঞতা আর নিপুণ কারিগরির হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে একটি সাধারণ কাঠের স্তূপ রূপ নিচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ডিঙ্গি নৌকায়।
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল নৌকা। হাট-বাজারে যাওয়া, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহন সব ক্ষেত্রেই ছিল নৌকার ব্যবহার। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে চারদিকে পানি ছড়িয়ে পড়লে ডিঙ্গি নৌকাই ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, সড়ক পথের যোগাযোগের উন্নয়ন এবং নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
স্থানীয় কারিগর গনেশ সূত্রধর জানান, চাম্বল, আম ও কড়ই গাছের কাঠ দিয়ে মূলত ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করা হয়। একটি নৌকা নির্মাণে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। বাজারে এসব নৌকা বিক্রি হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায়।
তৈরি করা নৌকাগুলো উপজেলার মাদবরেরচর ও উতরাইল হাটে বিক্রি করা হয়। এছাড়া অনেক ক্রেতা সরাসরি কারিগরদের বাড়িতে এসে নৌকা কিনে নিয়ে যান।
নৌকা তৈরির প্রবীণ কারিগর শ্যামল সূত্রধর জানান, জন্মের পর থেকেই এই কাজ করছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। এই নৌকা তৈরির কাজই আমাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। বর্ষা এলে কিছুটা কাজ বাড়ে, কিন্তু আগের মতো আর চাহিদা নেই।
কাঠসহ সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। নদী-নালা ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মানুষ এখন নৌকা কম ব্যবহার করে। ফলে এই পেশা ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবুও প্রতি বছর বর্ষা এলেই নতুন আশায় বুক বাঁধেন সুতারবাড়ির কারিগররা। তাদের বিশ্বাস, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা নৌকা শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও জানান, একসময় শিবচরের বিভিন্ন এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল কল্পনাই করা যেত না। এখন অধিকাংশ এলাকায় সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠায় নৌকার ব্যবহার অনেক কমে গেছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তারা মনে করেন, নৌকা শুধু একটি বাহন নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ, কারিগরদের আর্থিক সহায়তা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম. ইবনে মিজান বলেন, নৌকা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জন্য সরকারি ক্ষুদ্র ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

