সাক্ষাৎকার

তরুণদের সফট ও হার্ড স্কিল অর্জন করতে হবে

তরুণদের সফট ও হার্ড স্কিল অর্জন করতে হবে

বর্তমান সময়ে চাকরির বাজার ও কর্মক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু একাডেমিক ফল বা একটি ডিগ্রি অর্জন করলেই ক্যারিয়ারে সফলতা নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা, সমস্যা সমাধান ও নতুন কিছু শেখার মানসিকতার মতো সফট স্কিলও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিসিস, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো দক্ষতার চাহিদাও বাড়ছে। তরুণদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন, ব্যর্থতা মোকাবিলা এবং কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার কৌশল নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ ইসমাইল, পিএইচডি (কেমব্রিজ, ইউকে)।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়ে একজন তরুণের ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কী বলে আপনি মনে করেন?

প্রথমত, একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়েই পড়াশোনা করুক না কেন তাকে ভালো ফলাফল করতে হবে। তবে বর্তমানে শুধু ভালো ফলাফল বা ডিগ্রি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সময়ানুবর্তিতা, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি এমন কিছু সফট স্কিল বা দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও মানসিক বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, নতুন কিছু শেখা ও করার মানসিকতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এসব বিষয় পড়াশোনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন, কর্মজীবন এবং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল করার পাশাপাশি ক্যারিয়ারের জন্য আর কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করা জরুরি?

ভালো ফলাফলের পাশাপাশি একটি সফল ক্যারিয়ারের জন্য প্রধানত সফট স্কিল বা কোমল দক্ষতা এবং হার্ড স্কিল বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা—দুটিই অর্জন করা জরুরি। যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা, মানসিক চাপ মোকাবিলা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, অভিযোজনযোগ্যতা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলা এবং নেটওয়ার্কিংয়ের মতো সফট স্কিল প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সহজে পরিমাপযোগ্য হার্ড স্কিলও অর্জন করতে হবে। হার্ড স্কিল মূলত জ্ঞান ও কাজভিত্তিক দক্ষতা; যেমন—গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা, প্রোগ্রামিং প্রভৃতি। কাজেই ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য সফট স্কিল ও হার্ড স্কিল উভয়ই প্রয়োজন।

বর্তমান চাকরির বাজারে কোন কোন স্কিলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি? শিক্ষার্থীরা কীভাবে এসব দক্ষতা অর্জন করতে পারে?

হার্ড স্কিলের পাশাপাশি সফট স্কিল তো অবশ্যই প্রয়োজন। এর সঙ্গে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিসিস, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো দক্ষতার চাহিদাও বেড়েছে। একজন শিক্ষার্থীর ভালো একাডেমিক ফলাফলের সঙ্গে যদি এআই কিংবা সাইবার সিকিউরিটির মতো জ্ঞান যুক্ত হয় এবং তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সফট স্কিল থাকে, তাহলে চাকরির বাজারে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীরা সরাসরি বিভিন্ন কোর্সে অংশ নিতে পারে, কিংবা বিশ্বমানের ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম থেকে বিনা মূল্যে বা কম খরচে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মাধ্যমে ছোটখাটো প্রজেক্ট বা ফ্রিল্যান্স কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করা সম্ভব।

অনেক তরুণ ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। নিজের ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কী বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত?

তরুণ বয়সে ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা খুবই স্বাভাবিক। সঠিক ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। আত্মবিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও শক্তি, আগ্রহ, কাজের প্রতি ভালো লাগা, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও সম্ভাবনা, সামাজিক সুরক্ষা, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, মানুষ যা চায় তা সবসময় অর্জন করতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের প্ল্যান-এ, প্ল্যান-বি এবং প্রয়োজনে প্ল্যান-সি মাথায় রেখেই ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজজীবন থেকেই ক্যারিয়ার প্রস্তুতি শুরু করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

ক্যারিয়ার প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে দক্ষতা অর্জন, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাদার যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলা। প্রথম কাজই হচ্ছে লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কারণ সঠিক লক্ষ্য ঠিক করতে পারলে কাজের অর্ধেক হয়ে যায়। এরপর সেই লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করা যায়, সে অনুযায়ী নিয়মিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ শেখা, নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং ভালো ফলাফলের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। নেটওয়ার্কিংয়ের একটি বড় জায়গা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ। শিক্ষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা, সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কানেক্টিভিটি তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, পার্টটাইম কাজ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম বা বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। এছাড়া পুঁথিগত বা তাত্ত্বিক জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ শেখা যায়, নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ে, সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি হয় এবং নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।

যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলে?

আমি বলব, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা ক্যারিয়ারের তিনটি মূল দক্ষতা। প্রতিটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক যোগাযোগ কর্মক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি কমায়, সহকর্মী, ক্লায়েন্ট বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে এবং আপনার কাজের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সংকটের সময় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার মতো নেতৃত্বের গুণাবলি সাফল্যের সিঁড়ি তৈরি করে। একইভাবে সবার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের অহংকার একপাশে রেখে দলের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা একজন কর্মীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যারিয়ারের শুরুতে ব্যর্থতা বা প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়ার বিষয়টি কীভাবে একজন তরুণের মোকাবিলা করা উচিত?

এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে। তবে কোনো ব্যর্থতাই জীবনের শেষ নয়, এটি মনে রাখতে হবে। প্রথমে নিজের ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং আত্মমূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কেন প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি, তা বিশ্লেষণ করে বাজার-উপযোগী নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। হতাশাকে সাময়িক বিষয় হিসেবে দেখতে হবে এবং ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করতে হবে। একটি ব্যর্থতা ভবিষ্যতের সাফল্যের পথ বন্ধ করে দেয় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় তরুণদের ক্যারিয়ারে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনে সময় ব্যয় করলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, মনোযোগ নষ্ট হয় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়। ফলে নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন, তা অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। প্রযুক্তিকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যাবে না; বরং প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতি করতে গিয়ে কোন ভুলগুলো তরুণদের সবচেয়ে বেশি করতে দেখা যায়?

পরিস্থিতি না বুঝে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ নেওয়া, দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে গাফিলতি করা এবং পেশাদার যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি না করা—এসব ভুল তরুণদের মধ্যে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে কাজ করার ক্ষেত্রেও অনীহা দেখা যায়। অথচ কর্মজীবনে টিমওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, ধীরে-সুস্থে, সুচিন্তিতভাবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে গেলে এসব ভুল অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য রাতারাতি বড় কিছু হওয়ার চেষ্টা না করে ধৈর্য ধরে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়াতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন