চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আকুতি নদীপাড়ের মানুষের

চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আকুতি নদীপাড়ের মানুষের

পদ্মার তীরে একসময় ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, উঠান, ফসলের মাঠ আর চলাচলের রাস্তা। সকাল-বিকেল সেই পথ ধরে মানুষের চলাচল, শিশুদের ছুটোছুটি আর জীবিকার ব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। এখন সেখানে ভাঙনের শব্দ। তীব্র স্রোতে একের পর এক নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও সড়ক। ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন নদীপাড়ের মানুষ।

বিজ্ঞাপন

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবার আলম খাঁর কান্দী এলাকায় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙন। গত কয়েক দিনে ভাঙনে প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি বসতবাড়ি, দুটি দোকান, ফসলি জমি ও ইটের সড়কের অংশ। ভাঙন ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন আশপাশের প্রায় ৪০০ পরিবার।

স্থানীয়দের কাছে নদীভাঙন এখন শুধু আতঙ্ক নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কারও ঘরের চাল খুলে নেওয়া হচ্ছে, কেউ সরিয়ে নিচ্ছেন দরজা-জানালা। কেউ আবার শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে ছুটছেন নিরাপদ জায়গার সন্ধানে।

ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ের মাটি ক্রমেই ধসে পড়ছে। পদ্মার স্রোত আছড়ে পড়ছে তীরে। কোথাও বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে, কোথাও গাছপালা কেটে নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি পরিবার ইতোমধ্যে তাদের বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকলে আরও বহু পরিবারকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হবে।

গত দুই দিনে অন্তত ৩৫টি বসতঘর, গবাদিপশু ও দুটি দোকান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর, কলাবাগান ও বালুরটেক এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা এবং স্থানীয় বাজার।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হলেও তা ঠেকাতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে শুধু বসতবাড়ি নয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আশপাশের স্থাপনাগুলোও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।

ভাঙনকবলিত বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, চোখের সামনে বাড়ির পাশের মাটি নদীতে চলে যাচ্ছে। শেষ সম্বলটুকু কীভাবে বাঁচাব, সেটাই এখন চিন্তা। ঘর সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।

আরেক বাসিন্দা ইসমাইল বলেন, নদী কখন কোন দিক থেকে ভেঙে পড়ে বলা যায় না। পরিবার নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডও ভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা পাওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে আমরা অবগত আছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানিয়েছেন, ভাঙনের কারণে যেসব পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নদীপাড়ের মানুষের দাবি, সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ বা অন্য কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

পদ্মার পাড়ে এখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনিশ্চয়তার। কখন নদীর স্রোতে হারিয়ে যাবে শেষ আশ্রয়টুকু—এই শঙ্কায় দিন কাটছে শত শত পরিবারের। তাদের চোখে এখন একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে থামানো হোক পদ্মার আগ্রাসন, রক্ষা করা হোক মানুষের বসতভিটা ও জীবিকার শেষ অবলম্বন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন