রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার মাইনদারছড়া মুখপাড়া। পাহাড়-অরণ্যে ঘেরা এই জনপদে যাতায়াতের ভরসা নদীপথ ও সরু পথ। স্বাস্থ্যসেবা তো দূরের কথা, সাধারণ নাগরিক সুবিধাও সেখানে বিলাসিতা। ওই প্রান্তিক জনপদ থেকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া এক তরুণীকে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।
ঘটনাটি গত বছরের ১৫ ডিসেম্বরের। নিয়মিত পরিদর্শনে বিলাইছড়ির মাইনদারছড়া মুখপাড়ায় যান জিওসি। সে সময় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ চলছিল। এই কর্মসূচির মাঝেই জিওসির নজরে আসে ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যা নামের এক পাহাড়ি নারী। ২৬ বছর বয়সী ওমিল তীব্র পেটব্যথা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন।
সঙ্গে থাকা চিকিৎসকদের কাছ থেকে জেনে তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি গুরুতর। পাহাড়ি পথ বা নৌকা দিয়ে তাকে শহরে পাঠানো সময় ও ঝুঁকি—দুটোই অসহনীয়। ওই অঞ্চলের মানুষের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসার খরচ বা পরিবহনের ব্যবস্থাও প্রায় অসম্ভব। সিদ্ধান্ত নেন জিওসি নিজেই। কোনো বিলম্ব না করে তিনি ওমিলকে হেলিকপ্টারে তুলে নেন এবং সরাসরি উড়িয়ে আনেন চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)।
সিএমএইচে দীর্ঘ চিকিৎসা, ধরা পড়ে ক্যান্সার
চট্টগ্রাম সিএমএইচে ওমিল শোনার নিবিড় চিকিৎসা চলে টানা ১৫ দিন। বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন—তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। সিএমএইচে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে পাঠানো হয় গত রোববার সকালে। পুরো খরচই বহন করছে সেনাবাহিনী।
সিএমএইচের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন। জিওসি স্যারের সরাসরি একজন রোগীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনার ঘটনা সেনাবাহিনীর মানবিক ভূমিকার বাস্তব উদাহরণ। এতে স্থানীয় মানুষের আস্থা আরো বেড়েছে।
‘আর্মি না এলে আমার স্ত্রী বাঁচত না’
চট্টগ্রাম সিএমএইচে রোববার কথা হয় ওমিল শোনার স্বামী বস্তাময় তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেখানে থাকি সেখানে গাড়ি যায় না। নদী আর পাহাড়ের পথ পেরিয়ে আসতে হয়। আমার স্ত্রী ব্যথায় ছটফট করছিল। তখন আর্মি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। শহরে আমি কোনোদিন আসিনি, পথঘাটও চিনি না। সেনাবাহিনী না থাকলে ওকে চিকিৎসা করানো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমাদের পরিবারের জীবনটা যেন আবার নতুন করে ধরা দিয়েছে।’
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক হাসপাতালে ক্যান্সারের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। তাই ওমিল শোনাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য আমাদের দুজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। রোগীর স্বামীও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আছেন—এখান থেকেই তিনি হাসপাতালে যাতায়াত করেন।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


গুরুতর অসুস্থ পাহাড়ি নারীকে হেলিকপ্টারে করে সিএমএইচে নিল সেনাবাহিনী