দক্ষিণাঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে বরিশালের উজিরপুরে। উপজেলার সন্ধ্যা নদীতে জাঁকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে এই বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন উপভোগ করতে নদীর দুই তীর, সেতু ও আশপাশের এলাকায় লাখো মানুষের ঢল নামে। পুরো উজিরপুর পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
নৌকা বাইচ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মেজর এম এ জলিল সেতু বর্ণিল সাজে সাজানো হয়। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নির্মাণ করা হয় বিশাল মঞ্চ। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগমকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। নদীতে পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি ১০টিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী দল দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত রাখা হয় মেডিকেল টিম ও একাধিক অ্যাম্বুলেন্স। ফলে পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা বলয়।
আয়োজক সূত্র জানায়, আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার লক্ষ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বেসরকারি সংস্থা ‘আবাস’ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে।
প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) খলিল আহমেদ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশালের পুলিশ সুপার এ. জেড. এম. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক আসমা ফেরদৌসী এবং ‘আবাস’-এর নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল। অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম খান, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন খান, সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম আলাউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক (যুগ্ম সম্পাদক) রোকনুজ্জামান টুলু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সর্দার সিদ্দিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের সভাপতি আ. ফ. ম. সামসুদ্দোহা আজাদসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
দুপুর গড়ায়ার সঙ্গে সঙ্গেই সন্ধ্যা নদীর দুই তীর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ওপর নির্মিত মেজর এম এ জলিল সেতুতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড় জমে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ নৌকা বাইচ উপভোগ করায় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
৩১ অক্টোবর বিকেল ৩টায় শিকারপুর শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন সন্ধ্যা নদী থেকে প্রথম রাউন্ডের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। চারটি নৌকা নিয়ে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতা মেজর এম এ জলিল সেতু এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। পরবর্তী রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে দুই রাউন্ডের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী নৌকাগুলো নিয়ে পুনরায় ফাইনাল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী প্রতিযোগী নির্ধারণ করা হয়। পরে বিজয়ী দলের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার গ্রহণের সময় বিজয়ী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলামের নির্দেশনায় পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে এ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শেষ হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এ আয়োজন। এর আগে গত বছরের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যা নদীতে প্রথমবারের মতো নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো এ আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও আমাদের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

