নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি

মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই মাছ শিকারে যান উপকূলীয় জেলেরা

মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই মাছ শিকারে যান উপকূলীয় জেলেরা
ছবি: আমার দেশ

পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিদিনই মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যান পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলের হাজার হাজার জেলে। কিন্তু অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলারে নেই পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

অনেক ট্রলার আবার বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছে। ফলে বৈরী আবহাওয়া বা দুর্ঘটনা ঘটলেই বাড়ছে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ জেলে সমুদ্র ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

এর মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। তবে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব এবং সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠী।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি জেনেও তাদের গভীর সমুদ্রে যেতে হয়। অনেক ট্রলার মালিক অধিক লাভের আশায় নির্ধারিত সীমার বাইরেও মাছ ধরতে পাঠান। অথচ সময়মতো আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, দ্রুত উদ্ধার সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে একের পর এক দুর্ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসেই বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে অন্তত ১০টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। এতে ৫০ জনের বেশি জেলে নিখোঁজ হন।

অনেককে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। গত ৭ ও ১৫ জুলাই কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসে দুই জেলের লাশ।

ট্রলার মালিকরা বলছেন, প্রতিটি ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, ইমার্জেন্সি পজিশন ইন্ডিকেটিং রেডিও বিকন (ইপিআইআরবি), ফার্স্ট এইড বক্স ও অন্যান্য আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন করতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতে কোনো ভর্তুকি বা আর্থিক সহায়তা না থাকায় অনেক মালিক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রতিটি ট্রলারে বাধ্যতামূলকভাবে লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, ইপিআইআরবি, ভিএইচএফ যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস, ফার্স্ট এইড বক্সসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকি জোরদার করা হলে উপকূলের জেলেদের প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলে মতি হাওলাদার বলেন, ‘পেটের দায়ে জীবন হাতে নিয়েই সাগরে যাই। ঝড়-দুর্যোগের ভয় থাকলেও বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থা নেই।’

আরেক জেলে আব্দুল মান্নান শিকদার বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়লে অনেক সময় কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। দ্রুত উদ্ধারও মেলে না।’

ট্রলার মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনায় সহায়তা দেয়, তাহলে আমরা ট্রলারগুলোকে আরও নিরাপদ করতে পারব।’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকার বলেন, ‘সমুদ্রে জেলেদের প্রাণহানি কমাতে আধুনিক নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, দ্রুত আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং জেলেদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘পটুয়াখালী জেলায় প্রায় এক হাজার ট্রলারের সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ অনুমতিপত্র রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ১০ হাজারের বেশি ট্রলার সাগরে যায়। অনিবন্ধিত ট্রলারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন