বিপিসির অনিয়ম-দুর্নীতি

আ.লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ৬ কর্মকর্তাকে বারবার পদোন্নতি

আ.লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ৬ কর্মকর্তাকে বারবার পদোন্নতি
ছবি: সংগৃহীত

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় সুপারিশে নিয়ম লঙ্ঘন করে পেয়েছেন নিয়োগ, এরপর বছর বছর বাগিয়ে নিচ্ছেন পদোন্নতি। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতন হলেও পদোন্নতির এই ধারা ধরে রেখেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিপিসির ৬ বিতর্কিত কর্মকর্তা। যা নিয়ে বিপিসি ও অংগ প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

চাকরির নির্ধারিত মেয়াদকাল পূর্ণ না হতেই ওই ছয় কর্মকর্তাকে উচ্চগ্রেডের বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে প্রতি মাসে। এদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে বয়সসীমা অতিক্রম করে দলীয় সুপারিশে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিপিসির নিজস্ব প্রবিধান এবং জাতীয় বেতন নীতির বিভিন্ন ধারা অমান্য করে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—তিনজন উপমহাব্যবস্থাপক এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন এবং তিনজন ব্যবস্থাপক—মিজানুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আমেনা ফেরদৌসী ও ইসতিয়াক হোসেন। নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রতিটি পদোন্নতিতে পদে পদে নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি যাবতীয় ডকুমেন্ট আমার দেশের হাতে এসেছে। তবে বিপিসির দাবি সুপিরিয়র সিলেকশন কমিটির সিদ্ধান্তেই তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়নি।

বিপিসি সূত্র জানায়, চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৯ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপক পদে ৫০ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু বিপিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পদে কোনো সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়নি; বরং সকল পদই শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল সিনিয়র সিলেকশন কমিটির সুপারিশে পাঁচজন উপব্যবস্থাপককে একই বছরের ৬ মে সরাসরি ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা প্রবিধানমালার সরাসরি লঙ্ঘন। তাদের মধ্যে ছিলেন এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন, মো. মিজানুর রহমান ও আমেনা ফেরদৌসী। পরে ২০২৫ সালের ২ জুলাই এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরের ১০ জুলাই ইসতিয়াক হোসেনকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৯ অনুযায়ী, উপব্যবস্থাপক পদে পূর্ণ গ্রেড পেতে ন্যূনতম পাঁচ বছর, ব্যবস্থাপক পদে ১০ বছর এবং উপমহাব্যবস্থাপক পদে ১২ বছর চাকরিকাল পূর্ণ হতে হবে। তবে সংশ্লিষ্টদের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের দুই থেকে তিন বছর আগেই উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা ভোগ করে আসছেন ওই ছয় কর্মকর্তা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির জানান, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। মানুষ তেল পায় না, গ্যাসের জন্য দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর এই সেক্টরের কর্মকর্তারা ব্রুনাই রাজার মতো চলাফেরা করে। তাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করবে তারাও তাদের অধীনস্তের মতো আচরণ করে। কোনো কর্মকর্তার ১০ বছর চাকরি করার পর যে সুবিধা নেয়ার কথা, সাত বছরেই সেই কর্মকর্তা ওই সুবিধা নিলে এটা ভয়াবহ দুর্নীতি। এ ধরনের অনিয়মের বিচার না হলে জ্বালানি খাতের শৃঙ্খলা ফিরবে না।

পদোন্নতি পাওয়া এস এম জুবায়ের হাসান ২০১০ সালের ১ নভেম্বর বিপিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৪ সালের ২৬ জুন তিনি উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। সেখানে পূর্ণ বেতন পাওয়ার ন্যূনতম চাকরিকাল প্রয়োজন পাঁচ বছর, কিন্তু তার চাকরিকাল তখন মাত্র তিন বছর সাত মাস ২৫ দিন। অর্থাৎ তিনি ১৬ মাস আগে থেকেই উচ্চতর গ্রেডের পূর্ণ বেতন, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করেন। অথচ তার পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের সময় ছিল ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর। পরে তিনি ২০২১ সালে ব্যবস্থাপক (৫ম গ্রেড) পদে এবং ২০২৫ সালের ২ জুলাই উপমহাব্যবস্থাপক (৪র্থ গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান।

এ ব্যাপারে এস এম জুবায়ের হাসান বলেন, পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়, বিপিসিসহ বেশ কয়েকটি দপ্তরের সমন্বয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিলেকশন বোর্ড আছে, তারা যাচাই বাছাই করেই পদোন্নতিগুলো দিয়ে থাকে। এখানে মেয়াদপূর্তি কিংবা অন্যকোনো বিধান লঙ্ঘন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আমাদেরকে বঞ্চিতই করা হয়েছে। একটি গোষ্ঠী বেশ কিছু ভুয়া অভিযোগ লিখে বিভিন্ন দপ্তরে উড়ো চিঠি দিয়ে আমাদের কয়েকজনকে হয়রানি করছে। আপনার কাছেও ওই উড়ো চিঠি আর বায়বীয় অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। এর কোনো সত্যতা নেই।

মো. নাজিম উদ্দীন উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হিসেবে ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট বিপিসিতে যোগদান করেন। যোগদানের সময় তার বয়স ছিল ৩৪ বছর পাঁচ মাস ছয়দিন। কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়সসীমার শর্ত ছিল ৩৩ বছর। তিনি প্রায় এক বছর পাঁচ মাস বয়সসীমা অতিক্রম করার পর বিপিসিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৬ মে তিনি ব্যবস্থাপক (৫ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান, এখানেও পদোন্নতিতে চাকরিকালের সময় ১০ বছর হলেও তিনি ছয় বছর আট মাস ১৪ দিনে পদোন্নতি পান। এতে তিনি অতিরিক্ত ৩৯ মাস উচ্চতর পদের বেতনসহ সব ধরনের সুবিধা ভোগ করছেন।

এরপর ২০২৫ সালের ২ জুলাই তিনি উপমহাব্যবস্থাপক (৪র্থ গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। এই পদের জন্য ন্যূনতম সময়কাল ১২ বছর হলেও তিনি ১৩ মাস আগেই উচ্চতর পদের সুবিধা পেয়েছেন। বিধি বিধান মানলে তার এই পদের সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে।

এ ব্যাপারে মো. নাজিম উদ্দীন বলেন, নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি কোনোটাই তার হাতে নেই। সবই বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদারকি করে। তারা নিশ্চয় কোনো প্রবিধান লঙ্ঘন করে কাউকে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি দেবেন না।

মোছা. সিরাজাম মুনীরা ২০১৪ সালের ২৯ জুন উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হিসেবে বিপিসিতে যোগদান করেন। যোগদানের সময় তার বয়স ছিল ৩৩ বছর সাত মাস ৩০ দিন। অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩৩ বছর। অর্থাৎ নির্ধারিত বয়সসীমার বাইরে থেকেও তিনি চাকরিতে প্রবেশ করেন। এরপর ২০২১ সালের ৬ মে তিনি ব্যবস্থাপক (৫ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। এই পদে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য ন্যূনতম চাকরিকাল ১০ বছর। তিনি ৩৮ মাস আগে মূল বেতনসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করেন। নিয়ম অনুযায়ী তার ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ২৯ জুন।

এরপর ২০২৫ সালের ২ জুলাই সিরাজাম মুনীরা উপমহাব্যবস্থাপক (৪র্থ গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। এখানে পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য চাকরিকাল প্রয়োজন ১২ বছর। কিন্তু পদোন্নতির সময় তার মোট চাকরিকাল ছিল মাত্র ১১ বছর তিন দিন। অর্থাৎ ন্যূনতম যোগ্যতা পূর্ণ হওয়ার প্রায় এক বছর আগে তিনি উচ্চতর গ্রেডের পূর্ণ বেতন ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করে আসছেন।

এ ব্যাপারে সিরাজাম মুনীরা জানান, আমার জানা মতে আমার নিয়োগ কিংবা পদোন্নতিতে কোন ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। তারপরও আপনাদের কাছে এমন ডকুমেন্ট থাকলে বিপিসির সাচিবিক বিভাগে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই বাছাই করে দেখতে পারেন।

মো. মিজানুর রহমান এবং আমেনা ফেরদৌসী ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল বিপিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি উপব্যবস্থাপক পদে (৬ষ্ঠ গ্রেড) পদোন্নতি পান। তাদের চাকরিকাল তখন তিন বছর আট মাস ১৫ দিন। যেখানে ওই বেতন গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার ন্যূনতম সময়কাল ৫ বছর। কিন্তু দুই কর্মকর্তাই উচ্চতর বেতন গ্রেডের ন্যুনতম সময় পার হওয়ার ১৬ মাস আগেই বেতনসহ আনুষঙ্গিক সব সুবিধা গ্রহণ করেন। ওই সময়ে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল কিংবা পরে।

এরপর ২০২১ সালের ৬ মে তারা ব্যবস্থাপক (৫ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান তারা। তাদের ক্ষেত্রেও উচ্চতর পদোন্নতির জন্য চাকরিকাল ন্যূনতম মেয়াদ ১০ বছর মানা হয়নি।

আরেক কর্মকর্তা মো. ইসতিয়াক হোসেন ২০১৬ সালের ২৭ জুন উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হিসেবে বিপিসিতে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ব্যবস্থাপক (৫ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান।

এ ব্যাপারে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানান, ছয় কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিযোগটি আমাদের কাছে এসেছে। আমরা অভিযোগের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটিও করেছে। ওই কমিটি কাজ করছে। তদন্ত চলমান থাকা কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর প্রমাণিত না হলে তাদেরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। বিপিসিতে এমন নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি কিংবা নিয়োগের কোনো সুযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শাহিনা সুলতানা জানান, নিয়মানুযায়ী অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও এমন ঘটনা ঘটলে তদন্তে তা অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন