৮ মাসে কোরআনে হাফেজ ১২ বছরের মুয়াজ

প্রতিনিধি, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)

৮ মাসে কোরআনে হাফেজ ১২ বছরের মুয়াজ

মাত্র ১২ বছর বয়সের এক বিস্ময় বালক মেজবাহ উদ্দিন মুয়াজ। সাধারণত যেখানে পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ হিফজ (মুখস্থ) করতে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগে, সেখানে মাত্র ৮ মাসে পুরো ৩০ পারা কোরআন বুকে ধারণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এই কিশোর। তার এই কৃতিত্বে পটুয়াখালীর মহিপুর থানা সদরের বিপিনপুরের জিলাপিতলায় অবস্থিত ‘জামিয়া হযরত ওমর (রা.) মাদরাসায় বইছে আনন্দের হাওয়া।

সোমবার (২৫ মে) বিকেল ৩টায় এ অনন্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ মাদরাসার পক্ষ থেকে মুয়াজকে বিশেষ সম্মাননা স্মারক ও পাগড়ি প্রদান করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিস্ময়কর এই প্রতিভাবান মেজবাহ উদ্দিন মুয়াজ বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের সকিনা গ্রামের বাসিন্দা এবং মোয়াজ্জেমপুর ছালেহিয়া আলিম মাদরাসার শিক্ষক ক্বারী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের ছেলে। মুয়াজের এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে তার একাগ্রতা ও শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ছিল মুখ্য।

মাদরাসার হিফজ শাখার শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিন অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, মুয়াজ প্রথম থেকেই অন্য বাচ্চাদের চেয়ে আলাদা ছিল। ওর মেধা যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি পড়ার প্রতি মনোযোগ ছিল দেখার মতো। অনেক সময় দেখা যেত, অন্য ছাত্ররা যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, ও তখন কুরআন মাজিদ নিয়ে মগ্ন। মাত্র ৮ মাসে হিফজ শেষ করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত এবং মুয়াজের কঠোর পরিশ্রমের ফল।’

সম্মাননা পেয়ে উচ্ছ্বসিত খুদে হাফেজ মেজবাহ উদ্দিন মুয়াজ তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলে, ‘আমার খুব ইচ্ছা ছিল দ্রুত হিফজ শেষ করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করব। ওস্তাদজিরা আমাকে অনেক আদর করে পড়িয়েছেন। যখনই কোনো জায়গায় কঠিন লাগত, ওনারা সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। আমি ভবিষ্যতে বড় হয়ে ইসলামের একজন খাঁটি আলেম ও দাঈ হতে চাই। সবার কাছে দোয়া চাই।’

ছেলের এমন গৌরবময় অর্জনে খুশিতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে মুয়াজের বাবা, মোয়াজ্জেমপুর ছালেহিয়া আলিম মাদরাসার শিক্ষক ক্বারী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক এবং বাবা হিসেবে আজকের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। আমি নিজে মাদরাসার শিক্ষক হওয়ায় জানতাম কাজটা কতটা কঠিন। কিন্তু জামিয়া হযরত ওমর (রা.) মাদরাসার শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সঠিক গাইডলাইনের কারণে আমার ছেলে এত দ্রুত এই গৌরব অর্জন করতে পেরেছে। আমি মাদরাসার সকল শিক্ষক ও কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জামিয়া হযরত ওমর (রা.) মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবুল কালাম আজাদী বলেন, ‘মুয়াজ আমাদের মাদরাসার রত্ন। মাত্র ৮ মাসে হিফজ সম্পন্ন করে সে প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও সঠিক পরিবেশ থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব হয়। আমাদের মাদরাসা সবসময় ছাত্রদের পড়ালেখার মান এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে সর্বোচ্চ নজর দেয়। মুয়াজের এই সাফল্য অন্যান্য ছাত্রদেরও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে।’

অনুষ্ঠানে যুবদলের মহিপুর সদর ইউনিয়ন সভাপতি মো. মনির মুসুল্লী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন একটি মাদরাসা আছে এবং সেখান থেকে মাত্র ৮ মাসে একটা ছেলে হাফেজ হয়েছে, এটা পুরো মহিপুরবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। আমরা মুয়াজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।’

মহিপুর-আলিপুর মৎস্য হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার সরদার বলেন, ‘এই ছোট বয়সে মুয়াজের এই অর্জন আমাদের এলাকার জন্য একটি দৃষ্টান্ত। মাদরাসার শিক্ষাপদ্ধতি যে অত্যন্ত উন্নত, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।’

মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবুল কালাম আজাদীর সভাপতিত্বে দোয়া ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- মাদরাসার উপদেষ্টা হাফেজ আব্দুল বারেক ও হাফেজ আব্দুল মতিন, প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল খালেক কবিরাজ, মহিপুর থানা মুজাহিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আফজাল মুসুল্লী, আজিমপুর নূরানী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হাজী মো. মুসা আকন, মাদরাসার সিনিয়রসহ-সভাপতি কিরণ হাওলাদার, নাজিমে তালিমাত হাফেজ মো. হারুন হাওলাদার ও হেফজ শাখার শিক্ষক মো. শাহিন আলম।

অনুষ্ঠান শেষে হাফেজ মেজবাহ উদ্দিন মুয়াজের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য এবং মাদরাসার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন