গণভোট ব্যর্থ হলে সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে: জামায়াত আমির

গণভোট ব্যর্থ হলে সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে: জামায়াত আমির
বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান

জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যে গণভোটে ৭০ ভাগ জনগণ রায় দিয়েছে, সেই একই দিনের ভোটে আপনারা সরকার বলে এখন দাবি করছেন। ওই গণভোট না থাকলে এই সরকারও মানা হবে না। জনতার গণভোট যদি ব্যর্থ হয়, তবে এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ওই গণভোট মানতে জনগণ আপনাদের বাধ্য করবে ইনশাআল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

শনিবার বিকেলে বরিশাল নগরীর হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের দাবিতে বরিশালে বিভাগীয় এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহ-সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মুয়াজ্জম হোসাইন হেলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে আপনারা ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন, এদেশের ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ বলেছে। হ্যাঁ বলার মাধ্যমে তারা জানিয়ে দিয়েছে অতীতের পচা রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা আমরা আর চাই না। আমরা পরিবর্তন চাই, নতুন শাসন ব্যবস্থা চাই। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।

‘বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বলেছিলো, অধিকাংশ মানুষ যদি গণভোটে রায় দেয় তাহলে প্রত্যেক বিষয় অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ক্ষমতায় এসে তারা গণভোটের হ্যাঁ-কেই ভুলে গেলো।’

বিএনপিকে উদ্দেশ করে জামায়াত আমির বলেন, আপনারা ৯১ সালের পরে ক্ষমতায় এসে বোঝেন নাই কেয়ারটেকার সরকার কাকে বলে। শেষ পর্যন্ত বুঝেছেন ঠিকই। আমরা বলবো জাতির ক্ষতি করে বুঝবেন না, এখনই বুঝুন। আমরা রাজপথে এভাবে থাকতে চাই না। আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে চাই। কিন্তু আপনারা আমাদেরকে রাজপথের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। রাজপথ জ্বলে উঠলে সেই আগুনে অনেক কিছু পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।

বরিশালকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, সরকার গঠনের আগে আপনারা ৩১ দফায় বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে সারা দেশের সুষম উন্নয়ন করবেন। বরিশালকে বঞ্চিত করে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঢাকা থেকে সড়ক পথে ভাঙ্গা এসে যখন সেখান থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম, তখন দেখি ভাঙ্গার পরেই ভাঙ্গা রাস্তা শুরু হয়েছে। একটি বিভাগীয় মহাসড়কের দুই লেনের রাস্তা তাও আবার বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো।

তিনি বলেন, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেন করতে হবে। অথচ সরকার ও দক্ষিণাঞ্চলের সরকারি দলের এমপিরা এ ব্যাপারে কেউ কথা বলছেন না। কেন তারা জোরে আওয়াজ তোলেন না? ভোলা বাংলাদেশের অংশ, কেন ভোলা সবদিক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে? কেন ভোলা-বরিশাল সেতু হবে না? সরকারের কাছ থেকে আমরা জানতে চাই।

ডা. শফিক আরো বলেন, বরিশালবাসী রেল লাইনের গল্প শুনেছেন চোখে দেখেননি। কী অপরাধ বরিশালবাসীর? এখানে রেল লাইন দিতে হবে। বরিশালকে বঞ্চিত রেখে সুষম উন্নয়ন হবে না। তিনি বলেন, ভোলা বাংলাদেশের অংশ, কিন্তু ভোলা সারাদেশ থেকে একটি বিচ্ছিন্ন এলাকা। ভোলাবাসীর জন্য কোনো দয়া বা কারো করুণা নয়, ভোলা ব্রিজ নির্মাণ ভোলাবাসীর ন্যায্য দাবি।

একনেকে কেন ভোলা ব্রিজের প্রকল্প উঠানো হয়নি? আমরা জানতে চাই।

বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিকে আমি বুকে ধারণ করি উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। অথচ তারা যখন মেকানিজম করে ক্ষমতায় গেলেন তখন তারা গণভোটের কথা ভুলে গেছেন। সরকারকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ যে পথে হেঁটেছে আপনারা সেই পথে হাঁটছেন, জনগণ আসল ফ্যাসিবাদকে যখন পাত্তা দেয় নাই, সেখানে আপনারা কিছুই করতে পারবেন না। কারণ আপনারা আসল ফ্যাসিবাদের ধারেকাছেও যেতে পারবেন না।

সরকার জাতির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদের সাফ কথা, গণভোট না থাকলে সরকারকেও মানা হবে না। ২৪-এর আন্দোলনের শ্লোগানের মতো বক্ষে আগুন লাগাবেন না। ৭১-এর মর্যাদাও থাকবে, ২৪-এর বীরদেরও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় সরকারকে মানতেই হবে। যারা গণরায় মানে না, তারা গণতন্ত্রের শত্রু।

দ্রব্যমূলের যাঁতাকলে মানুষ পিষ্ট উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়ে আপনারা ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলছেন। এ দিয়ে কিভাবে পোষাবেন? কারণ ফ্যামিলি কার্ডে দিবেন আড়াই হাজার টাকা আর দাম বাড়িয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা।

তিনি আরো বলেন, বিএনপির উচিত দেশকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে পার্লামেন্টে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা, শপথ গ্রহণ করা এবং জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় কার্যকর করা। গণভোটের রায় মেনে নিয়ে সংবিধান সংস্কার করা হলে সংকটের সমাধান হবে। তা না হলে রাজপথে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প পথ থাকবে না।


আ. লীগের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। আওয়ামী লীগ আর কখনো বাংলাদেশে আসবে না। তিনি বলেন, ভারতে প্রতিনিয়ত মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করছে। বিভিন্ন উস্কানিমূলক কথা বলছে তারা। আমরা কিন্তু এতে কান দেবো না। আমরা আল্লাহর কোরআন মেনে চলি। অন্যের ওপর ক্ষতি করা আমরা কখনো বরদাশত করব না। অলি আহমেদ আরো বলেন, একটা আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে আমরা ১১ দল একজোট হয়েছি। আমরা চাই দেশ থেকে দুর্নীতি বন্ধ হোক, চাঁদাবাজি বন্ধ হোক, মাস্তানি ও দখলবাজি বন্ধ হোক।

দেশের মানুষকে ভয় দেখানো যাবে না

আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা সরকারের জন্যই ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। একইসঙ্গে জুলাই হত্যাকারীদের বিচার, শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং বরিশাল বিভাগের উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশের মানুষকে ভয় দেখানো বা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে দুপুরে সমাবেশস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বরিশাল নগর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে খন্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। দুপুর দুটার মধ্যেই পুরো সমাবেশ স্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়। এসময় হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সড়কে অবস্থান নেন।

সকাল থেকে বরিশালে থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য নেতাকর্মী সমাবেশে অংশ নেন। ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বেলা ২টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে ১২টার দিক থেকেই নেতাদের বক্তব্য শুরু হয়। জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি সৈয়দ আহমেদের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন।

এ ছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য দেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন