জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা কেবল স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ (ইশা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা একক পরিকল্পনার ফসল নয়; বরং ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের অর্জন। তাই এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখতে বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
শনিবার (১৮ জুলাই) ‘জুলাই জাগরণ ও স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মাঠে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। কর্মসূচিতে ছিল ফটো প্রদর্শনী, গণ-বিতর্ক, ছাত্রনেতাদের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভা এবং জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়ে প্যানেল আলোচনা।
দিনব্যাপী আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাইফ মুহাম্মাদ আলাউদ্দিন।
সকাল ১০টা থেকে টিএসসি মাঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিয়ে একটি দিনব্যাপী ফটো এক্সিবিশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রদর্শনীতে আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র, ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতিচারণ-ভিত্তিক তথ্যচিত্র স্থান পায়। শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন এবং আন্দোলনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা নেন।
দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয় গণ-বিতর্ক। বিতর্কের বিষয় ছিল “এই সংসদ বিশ্বাস করে, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কেবল স্মরণে নয়, নীতিনির্ধারণেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।” এতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শকে রাষ্ট্রীয় নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় “জুলাই পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির প্যাটার্ন: মত ও মতান্তর” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা অংশ নিয়ে জুলাই-পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১ নম্বর সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান অনিক, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি খায়রুল আহসান মারজান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি কাজী আশিক, ছাত্র অধিকার পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদমান আব্দুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাদের।
বাদ আসর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: অর্জন-অপূর্ণতা ও রাজনৈতিক বিভাজন” শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। এতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ, লেখক, গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক শায়খ মুসা আল হাফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল ইসলাম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সেক্রেটারি মাহাদী হাসান।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে একমুখী নয়, বরং বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা বলেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক শক্তির অর্জন নয়; এটি বিভিন্ন মত, আদর্শ ও চিন্তার মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল। সেই কারণে এই অর্জনকে সংরক্ষণ এবং এর চেতনাকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও সবার।
বক্তারা আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, “জুলাইয়ের প্রধান অর্জন হলো ভয়মুক্ত পরিবেশ অর্জন। আর কষ্টের বিষয় হলো, রেফারেন্ডাম বাস্তবায়িত না হওয়ার একমাত্র দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে জুলাই রেফারেন্ডাম।”
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে সাহস ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশ অর্জন করেছে, সেটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা হিসেবে আলোচিত রেফারেন্ডাম বাস্তবায়িত না হলে সেটি একটি বড় অপূর্ণতা হিসেবেই থেকে যাবে।
লেখক, গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক শায়খ মুসা আল হাফিজ বলেন, “জুলাইকে থামতে দেওয়া যাবে না; বরং বহুপ্রচেষ্টার মাধ্যমে জুলাইকে নিরন্তর জারি রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা কেবল একটি সময়ের আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটি যেন সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, সে জন্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে আয়োজকরা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। জুলাইয়ের অর্জন সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর চেতনা পৌঁছে দিতে ধারাবাহিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

